ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬,  ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
নকশা বহির্ভূত ভবন রক্ষা ও নজিরবিহীন রাজউক দুর্নীতি প্রটোকল ভেঙে জনতার সাগরে হেঁটে মানিক মিয়ায় প্রধানমন্ত্রী ষড়যন্ত্র করে গণতন্ত্রকামী মানুষকে দমানো যাবে না: প্রধানমন্ত্রী রিমান্ড শেষ: তাহসিফ হত্যা মামলায় কারাগারে দীপ নবাবগঞ্জে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রকে পুকুরপাড়ে বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন ডেঙ্গুতে আরও ৩ জনের মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১৬৭৪ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে বগুড়া খাদ্য অফিসে বহাল তবিয়তে শহিদুল কুমিল্লায় বছরে ১২০টি হত্যাকাণ্ড, অপরাধের ঊর্ধ্বগতিতে চরম উদ্বেগ ৭ নভেম্বরের আদর্শ ধারণ করেই ২০২৪-এর বিপ্লব সফল হয়েছে: রিজভী গ্রাম পুলিশদের বেতন বৃদ্ধি ও নতুন সুযোগ-সুবিধার ঐতিহাসিক ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে বগুড়া খাদ্য অফিসে বহাল তবিয়তে শহিদুল


  • আপলোড সময় : শনিবার ০৭ নভেম্বর, ২০২৬ সময় : ৬:৪৬ পিএম

বগুড়া প্রতিনিধি 

খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের গুপ্ত খাদক শহিদুল ইসলাম যখন যে জেলায় যান তখন সেই জেলায় খাদ্য বিভাগে ব্যবসা দেওয়ার নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। গ্রেপ্তার হলেও আইনের ফাঁক-ফোঁকরে বেরিয়ে আসেন তিনি।  তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক চেক ডিজঅনার মামলা রয়েছে। দুটি মামলায় আদালত থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছে। অথচ সব অভিযোগ ও মামলা চলমান থাকার মধ্যেই আবারও বগুড়া জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে যোগদান করেছেন তিনি। এতে ক্ষুব্ধ ভুক্তভোগীরা।


অভিযোগ রয়েছে, খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে তিনি বহাল তবিয়তে আছেন। এরআগে ২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর শহিদুলকে বগুড়া জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে গাইবান্ধায় তিনটি চেক ডিজঅনার মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল। যদিও একদিন কারাগারে থাকার পরই নিজের প্রভাব বিস্তার করে জামিনে মুক্ত হন তিনি। এছাড়া গাইবান্ধা, বগুড়া, লালমনিরহাট, নওগাঁ ও মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় ধান-চালের ব্যবসা এবং খাদ্য বিভাগের সরকারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা নিতেন শহিদুল। বিনিময়ে দিতেন ব্যাংকের চেক ও স্ট্যাম্পে চুক্তিনামা। পরে টাকা ফেরত চাইলে নানা টালবাহানা করতেন।


বগুড়া জজ আদালতের আইনজীবী সাইফুল ইসলাম নিরব জানান, বগুড়ায় শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুটি মামলা চলমান রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় চলতি বছরের ৭ অক্টোবর এবং অন্যটিতে ১৯ অক্টোবর আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন।


জানা যায়, বগুড়া খাদ্য বিভাগের হিসাবরক্ষক মোঃ শহিদুল ইসলাম গাইবান্ধা জেলা সদরের খামার পীরগাছা গ্রামের মোঃ নজরুল ইসলামের ছেলে। তাকে ঘিরে বেরিয়ে আসছে নানা প্রতারণার তথ্য। সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভনে ধান-চালের ব্যবসার নামে বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে তিনি কয়েক কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। ব্যাংক চেক এবং স্ট্যাম্প ব্যবহার করে দীর্ঘদিন চালিয়েছেন এই প্রতারণা। পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারের পর প্রতারণার বিষয়টি সামনে আসে। এরই মধ্যে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্তও হয়েছিলেন তিনি। ২০১৪ সালে গাইবান্ধা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে অফিস সহায়ক পদে চাকরি পান শহিদুল ইসলাম। এরপর অডিটর হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে প্রথমে লালমনিরহাট, পরে গাইবান্ধায় যোগ দেন। ২০২২ সালে শহিদুল আরেক দফা পদোন্নতি পেয়ে হিসাবরক্ষক হন। এর পর তিনি বগুড়া জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে যোগ দেন।


পরবর্তী ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষের দিকে তিনি বগুড়া থেকে বদলি হয়ে মৌলভীবাজারে যান। সেখানে কাজ না করে তদবিরের মাধ্যমে চলতি বছরের অক্টোবর মাসে উত্তরাঞ্চলের ধান-চালে উদ্বৃত্ত জেলা বগুড়াতে আবারও যোগদান করেন। শহিদুল প্রতারণা করতেন বেশ দক্ষতার সঙ্গে। ধান-চাল ব্যবসায় বিনিয়োগে আকর্ষণীয় লাভের প্রলোভনে সাধারণ ব্যবসায়ী কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা সংগ্রহ করতেন। বিনিময়ে লিখিত চুক্তি এবং ব্যাংক চেক দিতেন। সেসব চেকে ইচ্ছা করে ত্রুটি রাখার পাশাপাশি অ্যাকাউন্টে টাকা না থাকায় সেগুলো ডিজঅনার হতো। 

২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর গাইবান্ধায় তিনটি চেক ডিজঅনার মামলার পরোয়ানায় বগুড়া জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে শহিদুলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। একদিন কারাগারে থাকার পর জামিনে মুক্ত হন তিনি। এরপর ২০২৫ সালে বগুড়ার শ্যামলী হোটেলের ম্যানেজার মো. জামিল খানের কাছ থেকে ফুড পরিবহন ব্যবসা দেওয়ার কথা বলে ১২ লাখ ৯০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। এর বিপরীতে ইসলামী ব্যাংক গাইবান্ধা শাখার নিজের হিসাবের দুটি চেক দেন শহিদুল। পরে টাকা তুলতে গিয়ে জামিল জানতে পারেন, অ্যাকাউন্টে পর্যাপ্ত টাকা নেই। এ ঘটনায় ২০২৫ সালে বগুড়া আদালতে পৃথক দুটি চেক ডিজঅনার মামলা করেন তিনি। 


শ্যামলী হোটেলের ম্যানেজার জামিল খান বলেন, শহিদুল ইসলাম আমার কাছ থেকে ১২ লাখ ৯০ হাজার টাকা নিয়েছেন। টাকা ফেরত না দিয়ে প্রতারণা করেছেন। অনেক দিন তাঁর খোঁজ পাইনি। এখন শুনছি, আবারও বগুড়া খাদ্য অফিসে যোগ দিয়েছেন। এত অভিযোগ থাকার পরও কীভাবে তিনি সরকারি দপ্তরে চাকরি করছেন, সেটাই বুঝতে পারছি না।


শুধু জামিল নন, গাইবান্ধার নীলা বেগমের কাছ থেকে ১১ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে শহিদুলের বিরুদ্ধে। এছাড়া একই জেলা সদরের কামরুল হাসান জানান, ২০২১ সালের ২১ আগস্ট ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামা করে তিনি শহিদুলকে সাড়ে সাত লাখ টাকা দেন। পরে দুটি ব্যাংকের চেক দিলেও টাকা তুলতে পারেননি। এ ঘটনায় মামলা হলে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। সেই সময় গাইবান্ধার ব্যবসায়ী বিপু মিয়া সংবাদ মাধ্যমে জানিয়েছিলেন, খাদ্যগুদামে ধান-চাল সরবরাহের কাজ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে তাঁর কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা ধার নেন শহিদুল। পরে তিন লাখ টাকা ফেরত দিলেও বাকি দুই লাখ টাকা আর দেননি। 


ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রথমে অল্প কিছু টাকা ফেরত দিয়ে আস্থা অর্জন করতেন শহিদুল। পরে বড় অঙ্কের টাকা নিয়ে আত্মসাৎ করতেন। বগুড়া, লালমনিরহাট ও নওগাঁর কয়েক ব্যবসায়ীর কাছ থেকেও কোটি টাকার বেশি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।


অভিযুক্ত শহিদুল ইসলাম বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা। বরং তিনি অন্যদের কাছে টাকা পান। জমি বিক্রি করে পাওনাদারদের টাকা পরিশোধ করেছেন।


বগুড়া জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নাজমুল হক ভূইয়া বলেন, তিনি নতুন যোগদান করেছেন। শহিদুলের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ সম্পর্কে জানেন না। ব্যক্তিগত লেনদেন তাঁদের দেখার বিষয় নয়। তবে দাপ্তরিক কাজে টাকা নেওয়ার অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 


এ সম্পর্কিত আরো খবর