বাংলাদেশের দুর্নীতি নিয়ে আর লেখালেখি করতে মন চায় না। কারণ দুর্নীতি এ দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্যে চলছে। অনেক ব্যক্তি আছেন যারা নিজেরা সৎ মানুষ, কিন্তু বাধ্য হয়ে অধিকার আদায়ের জন্য ঘুষ প্রদান করতে হয়।
আমার এক চাচা, বয়স আশি বছর। তিনি পাকিস্তান আমলের বুয়েট ইঞ্জিনিয়ার, কাতারে খুব বড় চাকরি করেছেন। বর্তমানে তার কয়েকটি বাড়ি আছে, সেগুলো মেইনটেইন করতে বিভিন্নভাবে বিভিন্ন অফিসে তাকে ঘুষ দিতে হয়। তিনি খুব কষ্ট নিয়ে বলেন, "আমি জীবনে এক পয়সা ঘুষ খাইনি, অথচ বাংলাদেশে ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ করতে পারি না।" আসলে ঘুষ এখন একটি বৈধ জিনিস হয়ে গেছে। শুধু এই সরকারের আমলে নয়, পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন সরকারের আমলেই তা বেড়ে চলছে।
কতগুলো প্রতিষ্ঠানে আমি এমন দেখেছি, দাড়িওয়ালা, টুপিওয়ালা হুজুর দেখলে খুব সম্মান হয়, পরে দেখলাম তিনিও ঘুষ খান। ঘুষের টাকায় তারা বাড়ি করেন, ছেলে-মেয়েকে বিদেশে পড়ান, তারপর স্ত্রীকে নিয়ে কয়েকবার হজ করেন এবং মনে করেন সব পাপ মাফ হয়ে গেল। ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে আমার জ্ঞান কম, আমি জানি না তারা কীভাবে পাপমোচন করবেন। তারা যে ঘুষটা খেলো, সেটা সারা বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষের ট্যাক্সের টাকা। আমার মনে হয়, ২০ কোটি মানুষ যদি মাফ করে দেয়, তাহলে সেই ব্যক্তি মাফ পাবে।
সমাজে ঘুষখোর ব্যক্তিদের অনেক সম্মান। মসজিদের প্রথম কাতারে তাদের জন্য জায়গা রাখা হয় এবং হুজুর তাদের জন্য স্পেশাল দোয়া করেন, আমি নিজে দেখেছি তাই বলছি। আর যে ব্যক্তি সারা জীবন সততার সাথে চাকরি করলো, মাসের ২০ তারিখ গেলে যার বাসায় বাজার থাকে না, তাকে সমাজ দাম দেয় না। কারণ তারা বিবাহ অনুষ্ঠানে বড় গিফট দিতে পারে না, মাহফিলে তাদেরকে প্রধান অতিথি করা হয় না। বরং ঘুষখোর ব্যক্তিকেই প্রধান অতিথি করা হয়। আমি বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, কেউ কষ্ট পেলে তাতে আমার কিছু আসে যায় না।
আমার এক ভাই সরকারের অতিরিক্ত সচিব ছিলেন। তাকে দেখতাম দুপুরবেলা দুইটা রুটি আর আলু ভাজি খাইতেন, আমাকেও সকালে একটা রুটি দিতেন। সারা জীবন কষ্ট করে সততার সাথে চাকরি করেছেন। বাস্তব জীবনে কিছুই পাননি। দেখতাম ঘুষখোর সচিব প্রধান অতিথি হচ্ছেন, তার অনেক সুনাম করা হচ্ছে, কিন্তু এই সৎ সচিবকে কেউ দাম দিত না। মুখে বলতো ঠিকই, অন্তরে বলতো, "এ লোক দিয়ে লাভ নাই, এক টাকাও দিতে পারবে না।" তবে তিনি ন্যায়নীতি দিয়ে মানুষকে উপকার করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন। কারো কাছ থেকে জীবনে এক পয়সা নেননি এবং কারো কাছ থেকে এক কাপ চা-ও খাননি। আমি ব্যক্তিগতভাবে তার কাছে অনেক ঋণী, তিনি আমার জন্য সৎভাবে অনেক কাজ করেছেন। মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে তার আত্মার শান্তি কামনা করি।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) একজন সাবেক সিকিউরিটি গার্ড, পরবর্তীতে সিবিএ নেতা, শত কোটি টাকার মালিক হয়ে গেল। এটা একটা উদাহরণ দিলাম, এরকম উদাহরণ শত শত আছে এ দেশে।
আমি একজন ক্ষুদ্র সাংবাদিক হিসেবে যতটুকু পারি দেখি, কারো কাছ থেকে এক কাপ চা-ও খাইনি। আমার ব্যক্তিগতভাবে একটি ঘটনার কথা বলি। প্রকাশ থাকে যে, নকশা বহির্ভূত মধ্য বাড্ডা হোল্ডিং নং- গ-৫৮, ১২ ফিট রাস্তার উপর ৯ তলা বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে, ১ ফুট জায়গাও ছাড়া হয়নি। উপরন্তু পার্শ্ববর্তী জমির মালিকের আধা শতাংশ জমি দখল করে নিয়ে বাড়িটি করা হয়েছে।
আমার দৃষ্টিতে অবৈধ বাড়ি নির্মাণের জন্য অবৈধ বাড়ি নির্মাণকারী যতটা অপরাধ করেছে, তার চেয়ে বেশি অপরাধ করেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা। এই বাড়িটি রক্ষা করার জন্য মহাখালী জোনের অথরাইজড অফিসার জনাব মোঃ হাসানুর রেজা সাহেবের বক্তব্য অনুযায়ী, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) জনাব মোহাম্মদ মনিরুল হক থেকে শুরু করে ইন্সপেক্টর পর্যন্ত সবাই চেষ্টা করে যাচ্ছেন বাড়িটি রক্ষা করার জন্য।
অথচ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নিজেরাই এই বাড়ি ভেঙে ফেলার জন্য চূড়ান্ত নোটিশ দিয়েছিলেন, চিঠিতে উল্লেখ করেছেন এই বাড়িটি নকশা বহির্ভূত, ৩৫ শতাংশ ভেরিয়েশন করা বাড়ি। এখন চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন ইন্সপেক্টর রাজীব সাহেব পর্যন্ত সবাই চেষ্টা করছেন বাড়ি রক্ষা করার জন্য, এটা কি কারণে হতে পারে আমার বোধগম্য নয়। অথচ পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) ঢাকা শহরে অবৈধ নকশা বহির্ভূত শত শত বাড়ি ভেঙে ফেলছেন, এই বাড়িটার ক্ষেত্রে কি হলো? এই বাড়িটা রক্ষা করার জন্য এরকম চেষ্টা কেন করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্নের উদয় হচ্ছে।
এখানে কি অবৈধ লেনদেন হয়েছে, নাকি বড় রকমের কোনো তদবির হয়েছে, সে বিষয়টা জনগণের জানা দরকার। আমি অসুস্থ, ছয়টি ব্লকের ওপেন হার্ট সার্জারির পেশেন্ট, একা চলাফেরা করতে পারি না। আমি খুব বড় পত্রিকার সাংবাদিক না, এইজন্য হয়তো আমার বিষয়টি বাংলাদেশের সকল জায়গায় এখনো পৌঁছায়নি। এটি নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে সারা বাংলাদেশের মানুষকে এই দুর্নীতি জানাবো এবং পরে আইনগতভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
আসলে এখানে কে কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে? রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের বাসভবনের বাগান সংস্কারের নামে ৩০ লক্ষ টাকার বিল ৩ কোটি টাকা হয়ে গেল। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান তার নিজস্ব বাসভবনের সংস্কারের বিল দশ গুণ বৃদ্ধি পাওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না, তাহলে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মতো এত বড় প্রতিষ্ঠান তিনি কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন?
তাই রাষ্ট্রকে এই বিষয়টি ভেবে দেখার জন্য সবিনয় অনুরোধ করছি। এই দেশ থেকে দুর্নীতি দূর করতে না পারলে কোনো অবস্থাতেই এ দেশের উন্নয়ন হবে না। দুর্নীতি এ দেশের উন্নয়নের প্রধান বাধা। যেখানে আমাদের থেকে অনেক গরিব দেশ ছিল মালয়েশিয়া, তারা কত উপরে উঠে গেছে, সিঙ্গাপুর কোথায় অবস্থান করছে। তারা পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। আর বাংলাদেশ কোনোভাবেই দুর্নীতি দূর করতে না পারলে উন্নয়ন করতে পারবে না। সিঙ্গাপুরে একমাত্র উন্নয়ন হয়েছে কারণ তাদের দেশে কোনো দুর্নীতি হয় না।
সুতরাং বর্তমান সরকার এ দেশের উন্নয়নের জন্য যত চেষ্টাই করুক, আমি বারবার লিখছি, আসলে কে কার কথা শোনে? দুর্নীতির ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে, না হলে এ দেশ কোনোদিন উন্নত হবে না। সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের ঝাড়ুদার যেখানে কোটি টাকার মালিক, সে দেশে কী আশা করা যায়? আসলে এ দেশ থেকে দুর্নীতি দূর করার জন্য সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে, অন্যথায় এ দেশের আসল উন্নয়ন সম্ভব নয়।