ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬,  ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
নকশা বহির্ভূত ভবন রক্ষা ও নজিরবিহীন রাজউক দুর্নীতি প্রটোকল ভেঙে জনতার সাগরে হেঁটে মানিক মিয়ায় প্রধানমন্ত্রী ষড়যন্ত্র করে গণতন্ত্রকামী মানুষকে দমানো যাবে না: প্রধানমন্ত্রী রিমান্ড শেষ: তাহসিফ হত্যা মামলায় কারাগারে দীপ নবাবগঞ্জে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রকে পুকুরপাড়ে বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন ডেঙ্গুতে আরও ৩ জনের মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১৬৭৪ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে বগুড়া খাদ্য অফিসে বহাল তবিয়তে শহিদুল কুমিল্লায় বছরে ১২০টি হত্যাকাণ্ড, অপরাধের ঊর্ধ্বগতিতে চরম উদ্বেগ ৭ নভেম্বরের আদর্শ ধারণ করেই ২০২৪-এর বিপ্লব সফল হয়েছে: রিজভী গ্রাম পুলিশদের বেতন বৃদ্ধি ও নতুন সুযোগ-সুবিধার ঐতিহাসিক ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২ সফটওয়্যার তৈরি, সুফল মিলছে কতটা?


  • আপলোড সময় : শনিবার ০৭ নভেম্বর, ২০২৬ সময় : ১:০৪ পিএম

তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষার ব্যবহারকে সহজ ও সাবলীল করার মহৎ উদ্দেশ্যে হাতে নেওয়া হয়েছিল একটি মেগা প্রকল্প। কিন্তু দীর্ঘ এক দশক সময় পেরিয়ে এবং প্রায় ৮০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ ঢালার পর এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—আসলে কতটা কাজে লেগেছে এই উদ্যোগ? স্মার্টফোনে যখন বিনা মূল্যে বিশ্বমানের অজস্র অ্যাপ ও টুলস ব্যবহারকারীদের হাতের নাগালে রয়েছে, তখন সরকারি এই প্ল্যাটফর্মগুলোর অতি সামান্য ব্যবহার পুরো প্রকল্পটির উপযোগিতাকেই বড় এক ধোঁয়াশার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।


সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর কাগজডটএআই নামের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্ল্যাটফর্ম উদ্বোধন করেছিলেন। এই প্ল্যাটফর্মের ওসিআর সেবার মাধ্যমে ছবি বা নথি থেকে লেখা ওয়ার্ডে রূপান্তর করা সম্ভব। সে সময় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব জোর দিয়ে বলেছিলেন, ভাষা উন্মুক্ত করতে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুযোগ কাজে লাগিয়ে কাগজ টুলসের বিভিন্ন সুবিধা নেওয়া যাবে। অথচ বাস্তবতা হলো, সরকারি এই সেবার ব্যবহার অত্যন্ত নগণ্য। কারণ হিসেবে দেখা যায়, জনগণের স্মার্টফোনে থাকা গুগল লেন্স কিংবা অন্যান্য ফ্রি অ্যাপের মাধ্যমেই খুব সহজেই এই কাজগুলো অনেক আগে থেকেই করা সম্ভব হচ্ছে।


ছবি বা নথি থেকে লেখা ওয়ার্ডে রূপান্তরের পাশাপাশি অডিও থেকে লেখা তৈরি, বানান ও ব্যাকরণ সংশোধন এবং বাংলা ভাষা থেকে অন্য ভাষায় অনুবাদের মতো প্রায় ১২টি সফটওয়্যার তৈরি করতে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ খরচ করেছে দীর্ঘ ৮০ কোটি টাকা। আর এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে সময় লেগেছে প্রায় ১০ বছর। ‘গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ’ শীর্ষক এই প্রকল্পটি মূলত ২০১৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুমোদন লাভ করে। এটি বর্তমানে বাস্তবায়ন করছে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের অধীনস্থ স্বনামধন্য সংস্থা বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি)। প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত বরাদ্দ ধরা হয়েছিল প্রায় ১৫৮ কোটি টাকা, যার পুরোটাই সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে। নানা ধীরগতি ও অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে চলা এই প্রকল্পের মেয়াদ ইতোমধ্যে তিন দফায় বৃদ্ধি করা হয়েছে। সর্বশেষ গত বছরের আগস্ট মাসে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়।


সংশ্লিষ্ট সচেতন মহলের অভিমত, পূর্বের সরকারের নেওয়া এ ধরনের প্রকল্পগুলোর সঠিক মূল্যায়ন ও জড়িতদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার জোরালো সুযোগ থাকলেও তা না করে কেবল মেয়াদ বাড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। প্রকল্পটির বর্তমান অবস্থা নিয়ে জানতে চাইলে আইসিটি সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা জানান, বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ প্রকল্পের আওতায় বেশ কিছু টুল তৈরি করা হয়েছে ঠিকই, তবে সবকটি কাজ সমানভাবে অর্থবহ বা সফল হয়েছে এমনটি বলা যাবে না। টুলগুলো যেভাবে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর কথা ছিল, তা সেভাবে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমানে টুলগুলোকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে এনে কীভাবে ব্যবহারবান্ধব করা যায়, সে বিষয়ে কাজ চলছে। তিনি আরও জানান, বর্তমান সরকার আইসিটি খাতের চলমান প্রকল্পগুলো অন্ধভাবে বন্ধ করে দেয়নি, বরং যৌক্তিকতা যাচাই-বাছাই করে ১০ থেকে ১২টি প্রকল্পের পরিধি পুনর্মূল্যায়ন করেছে এবং অপ্রয়োজনীয় খাতগুলো বাতিল করেছে। তবে বিস্ময়করভাবে এই বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ প্রকল্পের বরাদ্দ বা ব্যয় কমানো হয়নি।


প্রকল্পের বিভিন্ন নথিপত্র ও সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ১৬টি সফটওয়্যার, টুল ও প্রযুক্তি উপকরণ তৈরির প্রাথমিক পরিকল্পনা থাকলেও গত ১০ বছরে মাত্র ১২টি উপাদানের কাজ শেষ করা সম্ভব হয়েছে। তবে এর মধ্যে সবকটি সেবাই সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত বা সহজলভ্য নয়। প্রকল্পের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে বাংলাডটগভডটবিডিতে এসব সফটওয়্যার ও সেবা যুক্ত করা হয়েছে। সরকারি বিভিন্ন সেবা সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে ‘জিজ্ঞাসা’ নামের একটি এআই সহকারী বা চ্যাটবট রাখা হয়েছে। এ ছাড়াও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য স্ক্রিন রিডার, ইশারাভাষা শনাক্তকরণ, ব্রেইল কনভার্টার, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষার তথ্যভান্ডার, বাংলা ফন্ট ও কিবোর্ড তৈরির কাজও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।


এখন পর্যন্ত প্রকল্পের পেছনে প্রায় ৮০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে সফটওয়্যার উন্নয়ন, হোস্টিং এবং সংরক্ষণ বা মেইনটেন্যান্স বাবদ ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬০ কোটি টাকা। বাকি অর্থ ব্যয় করা হয়েছে অফিস সাজসজ্জা, সভা-সেমিনার আয়োজন, প্রচারণা ও পরিচালন খাতে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এসব প্রযুক্তি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং কোন খাতে ঠিক কত টাকা ব্যয় হয়েছে তা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে। বিভিন্ন সেবার ব্যবহার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এগুলোর জনপ্রিয়তায় রয়েছে বিস্তর তফাত। উদাহরণস্বরূপ, ‘জিজ্ঞাসা’ নামের এআই চ্যাটবটে পরীক্ষামূলকভাবে দৈনিক গড়ে মাত্র ১১০টি অনুরোধ আসছে। অন্যদিকে ফন্ট রূপান্তরের সেবায় ৩৫ দিনে ফাইল রূপান্তর হয়েছে মাত্র ২৭৫টি। তবে বাংলা বানান যাচাইয়ের সেবাটি তুলনামূলক বেশি সাড়া পাচ্ছে এবং প্রতিদিন প্রায় পাঁচ লাখ অনুরোধ আসছে। অন্যদিকে কাগজডটএআই-এর ওসিআর সেবায় দৈনিক অনুরোধ আসে মাত্র ৫০টি।


প্রযুক্তির কার্যকারিতা যাচাই করতে বিভিন্ন সময়ে টুলগুলো পরীক্ষা করে দেখা গেছে, বানান সংশোধনের কাজটি সন্তোষজনক হলেও বড় আকারের অডিও থেকে লেখা তৈরির ক্ষেত্রে নানা জটিলতা দেখা দেয়। এ ছাড়া চ্যাটবট ‘জিজ্ঞাসা’ সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিলেও জটিল বা গভীর প্রশ্নে অনেক সময় বিভ্রান্তিকর তথ্য সরবরাহ করে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, জিপিইউ বা গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিটের সক্ষমতা সীমিত থাকার কারণে একসঙ্গে ৫ থেকে ১০ হাজার ব্যবহারকারীকে সেবা দেওয়া গেলেও এর চেয়ে চাহিদা বাড়লে ব্যবহারকারীদের অপেক্ষায় থাকতে হয়। ফলে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সেবাগুলো ব্যাপকভাবে পৌঁছে দিতে হলে অতিরিক্ত জিপিইউ এবং শক্তিশালী অবকাঠামো অপরিহার্য। প্রশ্ন উঠেছে, প্রায় ১৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্প শেষ হওয়ার পর এর রক্ষণাবেক্ষণ বা সচল রাখার দায়িত্ব কে নেবে?


এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক মাহবুব করিম জানান, প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি সমাপ্ত হওয়ার পর প্রযুক্তি ও তথ্যভান্ডার বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তীতে চাহিদার ভিত্তিতে জিপিইউ ক্রয় বা সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ বহাল থাকবে। তবে অতীতে এ ধরনের সরকারি প্রকল্পের অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর নয়। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মোবাইল গেম ও অ্যাপ্লিকেশন তৈরির নামে প্রায় ৩৩০ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, যার সিংহভাগই কোনো কাজে আসেনি। ওই প্রকল্পের মোট অর্থের ১৭ শতাংশের বেশি কেবল শেখ পরিবারের নামে সিনেমা ও গেম তৈরিতে অপচয় করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।


প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শুধু সফটওয়্যার তৈরি নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভাষাপ্রুযুক্তি উন্নয়নের জন্য একটি শক্তিশালী তথ্যভান্ডার তৈরি করা। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৮ হাজার কপিরাইটমুক্ত বই ডিজিটাল করা হয়েছে। বাংলা লেখাকে কণ্ঠে রূপান্তর কিংবা কথাকে লেখায় রূপান্তরের জন্য হাজার হাজার ঘণ্টার অডিও উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষার হাজার হাজার মিনিট অডিও এবং ইশারাভাষার বিপুল ভিডিও সংগ্রহ করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সফটওয়্যার নির্মাণ বা উপাত্ত সংগ্রহের পরিসংখ্যান দিয়ে একটি জাতীয় প্রকল্পের প্রকৃত সাফল্য বা ব্যর্থতা পরিমাপ করা যায় না। প্রযুক্তিগুলোর বাস্তবিক ব্যবহার, কার্যকারিতা এবং টেকসই স্থায়িত্বই হলো আসল বিবেচ্য বিষয়।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেনের মতে, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন প্রকল্পে অতীতেও ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অতীতের কর্মকাণ্ড এবং প্রকল্পের বাস্তব ফলাফল যাচাই-বাছাই না করে শুধু অন্ধের মতো প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে যাওয়ার অর্থ হলো পুরোনো অনিয়ম ও অপচয়কে নীরবে প্রশ্রয় দেওয়া। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার নামে আইসিটি খাতে ২১টি বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, যেগুলোর অনুমোদিত ব্যয় ছিল প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত মূল্যায়ন কমিটির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল যে, অনেক প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও কার্যক্রমের মধ্যে কোনো মিল ছিল না। অপ্রয়োজনীয় খাতগুলো বাদ দিলে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব হতো। এসব প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির মূল হোতা হিসেবে তৎকালীন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহ্‌মেদ পলক বর্তমানে কারাগারে থাকলেও, সংশ্লিষ্ট অনেক কুশীলব এখনো জবাবদিহির বাইরে রয়ে গেছেন।


এ সম্পর্কিত আরো খবর