সরকারের সর্বোচ্চ পদে থেকেও কোনো রকম প্রটোকল বা আনুষ্ঠানিকতার আড়ম্বর নয়, বরং এক অনবদ্য রাজনৈতিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন দেশের সরকারপ্রধান। রাজধানীর ব্যস্ত রাজপথে সাধারণ হাজারো জনতার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একটানা সাত কিলোমিটার পথ হেঁটে ইতিহাস সৃষ্টি করলেন তিনি। জাতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসে সরকারপ্রধানের এভাবে সাধারণ কর্মীদের কাতারে মিশে যাওয়ার ঘটনা এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। শনিবার রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র নয়াপল্টন থেকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ পর্যন্ত এক উত্তাল জনসমুদ্রে মিশে গিয়ে রাষ্ট্রনায়কোচিত ভঙ্গিমায় জনতার অভিবাদন গ্রহণ করেন তিনি, যা প্রত্যক্ষ করেছে পুরো দেশবাসী।
সরকারের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে অবস্থান করা সত্ত্বেও প্রটোকল ও প্রথাগত আনুষ্ঠানিকতার বলয় ভেঙে রাজপথে হাজারো জনতাকে সাথে নিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দীর্ঘ সাত কিলোমিটার পথ হেঁটেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বিএনপি আয়োজিত ঐতিহাসিক ‘সার্বভৌমত্ব’ র্যালিতে অংশ নিয়ে সরাসরি জনতার কাতারে মিশে যান তিনি। শনিবার (৭ নভেম্বর ২০২৬) বিকেলে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে শুরু হওয়া বর্ণাঢ্য এই মহা-র্যালিতে সশরীরে নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বিকেল সাড়ে ৩টায় নয়াপল্টন থেকে র্যালির আনুষ্ঠানিক সূচনা করে তিনি নেতাকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি পায়ে হেঁটে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করা শুরু করেন। এরপর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে র্যালিটি রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে পৌঁছে শেষ হয়।
দেশের ক্ষমতার শীর্ষে থাকা প্রধানমন্ত্রী এবং বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সাধারণ নেতাকর্মী ও আপামর জনগণের সঙ্গে এভাবে দীর্ঘ পথ হাঁটার নজিরবিহীন ঘটনাটি পুরো র্যালিতে এক অভূতপূর্ব ও ব্যতিক্রমী আবহ সৃষ্টি করে।
র্যালি চলাকালে প্রধানমন্ত্রীকে এক নজর দেখার জন্য পুরো সড়কের দুই পাশে ভিড় জমান হাজার হাজার সাধারণ মানুষ। শুধু তাই নয়, পথের পাশের বিভিন্ন উঁচু ভবনের বারান্দা, জানালা ও ছাদ থেকেও বিপুলসংখ্যক নারী, পুরুষ ও শিশু হাত নেড়ে প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও অত্যন্ত হাস্যোজ্জ্বল মুখে হাত নেড়ে সাধারণ মানুষের এই ভালোবাসার জবাব দেন। পুরো র্যালির দীর্ঘ পথ তিনি অত্যন্ত স্বাভাবিক গতিতে নেতাকর্মীদের পাশে থেকে হেঁটে অতিক্রম করেন।
ঐতিহাসিক এই বর্ণাঢ্য র্যালিটি নয়াপল্টন এলাকা থেকে শুরু হয়ে কাকরাইল মোড়, প্রধান বিচারপতির বাসভবন সংলগ্ন সড়ক, রমনা পার্কের পাশের সড়ক, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, বাংলামোটর, ফার্মগেট ও ইন্দিরা রোড অতিক্রম করে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে গিয়ে চূড়ান্তভাবে পৌঁছায়।
প্রধানমন্ত্রীর এই ব্যতিক্রমী সফর প্রসঙ্গে তাঁর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘এভাবে একজন প্রধানমন্ত্রীর পুরো রাজনৈতিক র্যালিতে সরাসরি হেঁটে অংশ নেওয়ার দৃশ্য বাংলাদেশের ইতিহাসে একদমই নজিরবিহীন। গণতান্ত্রিক ধারা পুনর্নির্মাণের অভিযাত্রায় এ দৃশ্য পুরো দেশবাসীকে ভীষণভাবে উজ্জীবিত করবে। অতীতে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশের খাল খনন কর্মসূচিতে গিয়ে মাইলের পর মাইল সাধারণ মানুষের সঙ্গে হেঁটেছেন।’
রাজপথের এই কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পদযাত্রায় অংশ নেন বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, আমান উল্লাহ আমান, দলের ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম মনি, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, হাবিব উন নবী খান সোহেল, কোষাধ্যক্ষ রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাহউদ্দিন টুকুসহ বিএনপি এবং এর সকল অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের হাজার হাজার নেতা-কর্মী-সমর্থক।
এর আগে বিকেল ৩টার দিকে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে নির্মিত অস্থায়ী মঞ্চে উপস্থিত হয়ে সংক্ষিপ্ত ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার এবং ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আজম খানসহ শীর্ষ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।
র্যালিকে কেন্দ্র করে সকাল দুপুর ১২টা থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ড এলাকা থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে নয়াপল্টনে সমবেত হতে শুরু করেন দলের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সমর্থক। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কাকরাইল মোড় থেকে ফকিরাপুল মোড় পর্যন্ত পুরো এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। নেতাকর্মীদের হাতে শোভা পায় বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আলোকচিত্রসংবলিত নান্দনিক প্ল্যাকার্ড। বিভিন্ন রঙের ক্যাপ ও টি-শার্ট পরে অংশ নিয়ে কর্মীরা পুরো অনুষ্ঠানকে বর্ণিল রূপ দেন।
উল্লেখ্য, দীর্ঘ প্রায় এক যুগ লন্ডনে অবস্থানের পর ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর স্বদেশে ফেরেন তারেক রহমান। দেশে ফেরার পর বিভিন্ন জনসভা ও রাজনৈতিক সমাবেশে বক্তব্য প্রদান করলেও বিএনপির দলীয় কোনো র্যালিতে হেঁটে তাঁর এটিই প্রথম অংশগ্রহণ।aaa