দেশবিরোধী যেকোনো অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি চক্রান্ত রুখে দিতে রাজপথে সোচ্চার বার্তাসহ বীরত্ব ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত হলো। ৭ ইতিহাসের প্রেক্ষাপট টেনে কড়া হুশিয়ারি উচ্চারণ করে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, রক্তে অর্জিত এ দেশের স্বাধীনতা ও স্বাধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অপচেষ্টা আর বরদাশত করা হবে না। ষড়যন্ত্রকারীদের সব চক্রান্ত নস্যাৎ করে দিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে রাজপথে সোচ্চার থাকবে আপামর জনগণ। ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত বিশাল র্যালিপূর্ব সমাবেশে এমনই ইস্পাতকঠিন ঘোষণা ভেসে এল।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘কোনো ষড়যন্ত্র দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণকে দমিয়ে রাখতে পারবে না।’ তিনি হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘দেশে আবারও ষড়যন্ত্র হচ্ছে। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের মতো দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে। দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষকে নিয়ে আমরা সকল ষড়যন্ত্রের জবাব দেব।’
শনিবার (৭ নভেম্বর ২০২৬) বিকেলে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত ‘সার্বভৌমত্ব’ র্যালিপূর্ব সংক্ষিপ্ত সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী এই হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
তিনি বলেন, ‘একাত্তরের মতো, নব্বইয়ের মতো, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের মতো আবারও দাঁতভাঙা জবাব আমরা দিতে চাই। আজকে ৭ নভেম্বরের সার্বভৌমত্ব র্যালি হোক আমাদের সেই প্রত্যাশা পূরণের দিন। আজকের এই র্যালি হোক বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করার দিন।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ জীবন দিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যে গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করেছে, সেটি হোক গণতন্ত্র রক্ষার দিন।’
নয়াপল্টনে উপস্থিত হাজার হাজার নেতা-কর্মীর কাছে সমর্থন চেয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা কি আমাদের সঙ্গে আছেন?’ এ সময় উপস্থিত নেতাকর্মী-সমর্থকরা মুহুর্মুহু করতালি দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে পূর্ণ সমর্থন জানায়।
বিকেল ৩টায় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে স্থাপিত অস্থায়ী মঞ্চে ওঠেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এবং দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ অন্যান্য জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ।
এর আগে দুপুর ১২টা থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ছোট ছোট মিছিল নিয়ে নেতা-কর্মীরা নয়াপল্টনে সমবেত হতে শুরু করেন। মুহূর্তের মধ্যেই কাকরাইল মোড় থেকে ফকিরাপুল মোড় পর্যন্ত এলাকা এক বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়। নেতা-কর্মীদের হাতে শোভা পায় বাংলাদেশের লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আলোকচিত্রসংবলিত প্ল্যাকার্ড। বিভিন্ন রঙের ক্যাপ ও গেঞ্জি পরিধান করে বর্ণাঢ্য এই র্যালিতে প্রাণ সঞ্চার করেন সর্বস্তরের কর্মীরা।
নেতাকর্মী-সমর্থকসহ দেশবাসীর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী পুনরায় বলেন, ‘দেশের ভেতর ও বাইরে ষড়যন্ত্র চলছে। দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষকে নিয়ে আমরা সকল ষড়যন্ত্রের জবাব দেব।’ তিনি উল্লেখ করেন, ‘৭ নভেম্বর হচ্ছে জাতীয় ঐক্যের দিন, ৭ নভেম্বর হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষার দিন, ৭ নভেম্বর হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের দিন।' এ সময় প্রধানমন্ত্রী নিজে স্লোগান ধরে বলেন, ‘দিল্লি নয়, পিণ্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ। সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ।’
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা শুধু স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে ফিরিয়ে আনে নাই, তারা স্বৈরাচার ও ষড়যন্ত্রকারীদের দেশ থেকে বিতাড়িত করেছে। যেভাবে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সেই অপশক্তি পরাজিত হয়েছিল, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট একইভাবে সেই অপশক্তি পরাজিত হয়েছে—দেশের মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণ ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।’
অতীতের মতো এখনও একটি বিশেষ পক্ষ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, ‘আবারও তারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ণ করতে চায়, আবার তারা আমি-ডামি নির্বাচনের ব্যবস্থা চালু করতে চায়। তবে এ সুযোগ আর দেওয়া হবে না।’
তিনি দৃপ্ত কণ্ঠে বলেন, ‘যে দেশের মানুষ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ করতে পারে, যে দেশের মানুষ ১৯৭৫ সালের সিপাহি-জনতার বিপ্লব ঘটাতে পারে, যে দেশের মানুষ ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে পারে, সে দেশের মানুষকে ষড়যন্ত্র করে দাবিয়ে রাখা যাবে না।’
সংক্ষিপ্ত বক্তব্য শেষ করে প্রধানমন্ত্রী পায়ে হেঁটে বর্ণাঢ্য এই র্যালিতে অংশ নেন। এ সময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষের সঙ্গে তিনি হাত উঁচিয়ে কুশল বিনিময় করেন। বিকেল সাড়ে ৪টায় প্রধানমন্ত্রী মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে পৌঁছে সমাপনী বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে দিবসের কর্মসূচির সমাপ্তি টানেন। মন্ত্রিপরিষদের সদস্যবৃন্দসহ সর্বস্তরের সর্বসাধারণ ও দলীয় নেতাকর্মীরা এই ঐতিহাসিক বর্ণাঢ্য র্যালিতে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন।