ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের বিকল্প নেই: ড. আবদুল মঈন খান স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা নেই: মীর শাহে আলম দুপুরের মধ্যেই বিদ্যুৎ পাচ্ছে বাংলাদেশ: কমবে লোডশেডিং এমপিও শিক্ষকদের নির্বাচন ভাগ্য নির্ধারণ করবে ইসি: মীর শাহে আলম সরকারি কেনাকাটায় পুকুরচুরি ঠেকাতে আসছে অভিন্ন একক দরতালিকা সাগর-রুনি হত্যার বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ তারুণ্য না অভিজ্ঞতা: ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব চয়নে জটিল হিসাব-নিকাশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জের রিট খারিজ হাইকোর্টে ইন্দোনেশিয়ায় ২৪০ যাত্রী নিয়ে জাহাজ নিখোঁজ ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত, আটক ২

সিরাজগঞ্জে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল ল্যাব এখন গলার কাঁটা


ছবি : সংগৃহীত

  • আপলোড সময় : সোমবার ১২ মে, ২০২৫ সময় : ৩:২৪ পিএম

সিরাজগঞ্জের তাড়াশে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল ল্যাব এখন গলার কাঁটা, প্রায় ৯ কোটি টাকা জলে পরিণত হয়েছে ই-বর্জ্যে। তাড়াশে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের আওতায় ১৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্থাপন করা হয় স্কুল অফ ফিউচার ও শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব (বর্তমান নাম আইসিটিডি)। পাশাপাশি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্প থেকে আরো ৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল ল্যাব প্রতিষ্ঠা করা হয়।


শিক্ষার্থীদের তথ্য ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে দক্ষতা, সক্ষমতা বাড়ানো ও স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলেও, বাস্তবে তা এখন গলারকাঁটা হয়েছে।



নিম্নমানের উপকরণ সরবরাহের ফলে শুরুতেই এসব ডিজিটাল ল্যাব মুখ থুবড়ে পরেছে। পরিণত হয়েছে ই-বর্জ্য। অথচ এসব ল্যাব পরিচালনা ও রক্ষণা বেক্ষণের জন্য একজন করে ল্যাব সহকারী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তারা সরকারি ভাবে নিয়মিত মাসিক বেতন ভাতা উত্তোলনও করছেন। এসব ল্যাব স্থাপনে এ উপজেলায় সরকারের প্রায় ৯ কোটি টাকা জলে গেছে। অভিযোগ রয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একটি সিন্ডিকেট পুরানো সংষ্করণের ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, প্রিণ্টার, স্ক্যানার, ওয়েবক্যাম, এলিইডিটিভি, হোয়াটবোর্ড, রাউটার, ইন্টারনেট, ট্যাব, সার্ভার সিস্টেম সহ যাবতীয় হার্ডওয়ার ও ফার্নিচার সরবরাহ করায় এ সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। তারা মানহীন পণ্য সরবরাহ করে এসব ল্যাব থেকে প্রায় দুই থেকে তিন কোটি টাকা সুকৌশলে হাতিয়ে নিয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে টেকনিশিয়ান চেয়ে বারবার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরে আবেদন করলেও, তাদের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি মর্মে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানেরা অভিযোগ করেন। উপজেলা আইসিটি অফিসারের কার্যালয় থেকেও সমস্যা নিয়ে প্রতিবেদন পাঠালেও তা কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। যারফলে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল প্রদ্ধতিতে শিক্ষা এবং অ্যানিমেশন ও রোবটিক্স সহ আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিতি লাভ কার্যত: অধরাই থেকে যাচ্ছে।


জানা যায়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন সময়ে তাড়াশ উপজেলায় ১৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পৌর সদরের তাড়াশ ইসলামীয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে স্থাপন করা হয় স্কুল অফ পিউচার। অবশিষ্ট ৭ টি স্কুল, ৪ টি কলেজ ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ১ টি মাদ্রাসায় শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন করা হয়। এ ছাড়াও আরো ৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প থেকে ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন করা হয়।


তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের সূত্র থেকে জানা যায়, এই আইসিটি ল্যাব স্থাপনের বিশেষ উদ্দেশ্য হলো, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একটি বিশেষ কক্ষ, যেখানে কম্পিউটার, ইন্টারনেটসহ অন্যান্য ডিজিটাল সরঞ্জাম রয়েছে। এই ল্যাব গুলি শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা প্রদান করে এবং নতুনতম আইসিটি সফটওয়ার এবং ডিভাইসগুলি কীভাবে ব্যবহার করতে হয় তা শিক্ষার্থীরা শিখতে পারে। এই ল্যাবে নিয়োগকৃত ল্যাব সহকারীর ল্যাব পরিচালনা করাই প্রধান কাজ। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার অন, অফ, ওয়ার্ডপ্রসেসিং, স্প্রেডশিট, সফটওয়ার ইন্সটল আনইন্সটল, হার্ডওয়ার সেটিং ও ফটোশপ ইত্যাদি কাজ শেখানো।

শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন প্রকল্পের (২য় পর্যায়) এক বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যায়, ল্যাব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ১৪ টি শর্ত প্রযোজ্য থাকলেও বাস্তবে তা মানা হয়নি। মূলত: সংশ্লিষ্ট আসনের সংসদ সদস্যরা সকল নিয়ম কানুন অমান্য করে তাদের পছন্দের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে ডিও লেটার দিয়েছেন এবং সে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। এসব ল্যাব প্রতিষ্ঠায় ঠিক কত টাকা ব্যয় করা হয়েছে তার সঠিক কোনো তথ্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে দেয়া হয়নি। এ বিষয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের বর্তমান প্রকল্প পরিচালক এ এস এম লোকমাননের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, এসব তথ্য তার জানা নেই। আগের প্রকল্প পরিচালক বলতে পারবেন। এ বিষয়ে পরে কথা বলবো।



তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন আইটি বিষেশজ্ঞ বলেন, এসব ল্যাব স্থাপনে গড়ে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। সে অর্থে তাড়াশ উপজেলায় মোট ১৮ টি ডিজিটাল ল্যাবে ৯ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অধিকাংশ ডিজিটাল ল্যাবই অচল হয়ে পরে রয়েছে।



তাড়াশ ইসলামীয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে স্থাপন করা স্কুল অফ পিউচার সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে প্রধান শিক্ষক মো: আব্দুস সালাম বলেন, অপারেটর না থাকায় কার্যত: স্কুল অফ ফিউচার কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এ বিষয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট বিভাগে বারবার চিঠি দিয়েও কোনো সাড়া পাননি।



নওগাঁ জিন্দানী ডিগ্রি কলেজে স্থাপিত ডিজিটাল ল্যাবে ৩০ টি ডেস্কটপ কম্পিউটার সহ ল্যাবের অন্যান্য ডিজিটাল সামগ্রী সম্পূর্ণই অচল। ল্যাবটি এখন ই-বর্জ্য ছাড়া আর কিছুই নয়।



এ প্রসঙ্গে নওগাঁ জিন্দানী ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো: বেলাল হোসেন আনছারী বলেন, নিম্নমানে ডিজিটাল সরঞ্জামাদি সরবরাহ করায় ল্যাব টি শুরুর কিছু দিনের মধ্যেই অচল হয়ে পরেছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দিয়েও কোনো উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না।
গুল্টা বাজার শহীদ এম, মনসুর আলী ডিগ্রি কলেজের ল্যাবটির দশা আরো করুণ। এ প্রতিষ্ঠানে ল্যাপটপ গুলো নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ৫ থেকে ৭টি কম্পিউটারের কোনো হদিস নেই। তাড়াশ উপজেলা আইসিটি অফিসারের কার্যলয় থেকে কম্পিউটার গুলো প্রতিষ্ঠানে ফেরত আনার তাগাদা দিলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।


অন্যান্য ল্যাবের অবস্থাও এ ৩টি ল্যাবের মতোই। তবে তাড়াশ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে কয়েকটি কম্পিউটার এখনো সচল রয়েছে। ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর ল্যাবের কক্ষটি কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরে কার্যক্রম ধীরগতি হওয়ায় মাঠ পর্যায়ে এ সমস্যা আরো প্রকট করে তুলেছে।



এ প্রসঙ্গে তাড়াশ উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তা মো: আবু রায়হান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, আমার অফিস থেকে বিভিন্ন ল্যাব পরিদর্শন করে উর্ধতন কর্তৃপক্ষ বরাবর প্রতিবেদন পাঠিয়েছি। ল্যাব প্রতিষ্ঠার সময় সংশিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদেরকে শুধু কাগজে কলমে জানায়। কত বরাদ্দ, কি কি মানের ডিজিটাল সামগ্রী ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান সরবরাহ করে, তাও তাদের কে জানানো হয়নি। ইলেক্ট্রনিক্স যন্ত্রপাতি নষ্ট হলে প্রতিষ্ঠান প্রধানরা এগুলো ফেলে রাখেন। যার ফলে তা একদিন অচল হয়ে যায়।
এ কর্মকর্তা আরো বলেন, দ্রুত অর্থ বরাদ্দ করে বিশেষজ্ঞ দ্বারা ল্যাবগুলি নিয়মিত সার্ভিস করা না গেলে, শিক্ষার্থীদের সরকারের আইসিটি শিক্ষা কোনোভাবেই দেয়া সম্ভব হবে না।


এ সম্পর্কিত আরো খবর