মামুনার রশীদ,বগুড়া।
কাঙালিনী সুফিয়ার কণ্ঠে উচ্চারিত হয়" ঘুমাইয়া ছিলাম- ছিলাম ভালো
জাইগা
দেখি বেলা নাই
কোন
বা পথে নিতাইগঞ্জে যাই?
এসএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরে যেসব শিক্ষার্থী অযথা ঘুরে ফিরে,মোবাইলে সময় কাটিয়ে যখন দেখবে রেজাল্ট সন্নিকটে তখন হয়তো তারাও সুফিয়ার মতো বলতে শুরু করবে' কোন বা পথে নিতাইগঞ্জে যাই।' এসএসসি -২০২৫ শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা শুরু হয়েছিল সেই ১০ এপ্রিল। ইতোমধ্যে তাদের থিওরিক্যাল পরীক্ষা শেষ আর এ মাসের ২৫ তারিখের ভেতর সব ব্যবহারিক পরীক্ষা শেষ হবে।ফলাফল আসতে এবং ভর্তি হতে মোট সময় তিন মাস।এ সুদীর্ঘ সময় শিক্ষার্থীরা কী করবে - এ প্রশ্ন সবার মনেই।প্রথমে আমরা নিজেদেরকে প্রশ্ন করবো 'আমরা পরীক্ষার্থী,নাকি শিক্ষার্থী?
পরীক্ষার্থী হলে আমরা আপাততঃ
বসে থাকবো,উদ্দেশ্যহীন সময় কাটাবো আর
যদি ভাবি আমরা শিক্ষার্থী
তাহলে তাকে থামা যাবে
না।ছুটতে হবে শিক্ষার উদ্দেশ্যে।বয়স
বাড়ার সাথে সাথে বিদ্যার
পরিধি বেড়ে যায়।একজন শিক্ষার্থীর
শিক্ষা বা বিদ্যা কখনো
শেষ হয় না।সুতরাং, শিক্ষার্থীরা
চুপচাপ বসে থাকবে না,তারা সিলেবাসের বাহিরে
কিছু শিখবে এ অবসর সময়ে।সক্রেটিস
বলেন," Know
thyself."নিজেকে জানো।আর শিক্ষার্থীরা নিজেদের দুর্বলতা জানবে,নিজেদের সক্ষমতা জানবে এবং এ সময়ে
তারা নিজেদেরকে আরও কার্যকর সময়
দিয়ে প্রস্তুত করবে- এটাই প্রত্যাশা।
বাংলাদেশের
একটা সচারাচর চিত্র হলো এসএসসি পরীক্ষা
শেষ; ব্যস এইচএসসি এর
জন্য নতুন করে প্রাইভেট
শুরু! এই যে প্রাইভেট
পড়ার দৌরাত্ম আর সিলেবাস কেন্দ্রীয়
পড়া আমাদের শিক্ষার্থীদের মন ও মস্তিষ্কের
ভেতর নতুনত্ব ও সৃজনশীল কিছু
দিতে পারছে না।হ্যাঁ,পড়ার বা পাঠ্যক্রম
শেষ করার অবশ্যই গুরুত্ব
আছে তবে তা যেন
শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল ও মেধা বিকাশের
পথে অন্তরায় না হয় - আমাদের
শিক্ষক ও সচেতন অভিভাবক
মহলের সে ব্যাপারে একটু
সজাগ হওয়া উচিত।এ সময়ে
শিক্ষার্থীরা কী করবে -এটার
জন্য আমি শিক্ষার্থীদের তিন
ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করতে চাই।এক দল
আছে যারা খেলা প্রিয়।তারা
এই তিন মাসে দেশের
বিভিন্ন ক্রীড়াঙ্গনে কোচের অধীনে ফুটবল ও ক্রিকেট খেলার
প্রশিক্ষণ নিতে পারে।খেলাধূলা শরীর
গঠনে যেমন ভূমিকা রাখে,তেমনি অর্থনৈতিকভাবেই এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
রাখছে।খেলাধূলায় ভালো করে তারা
নিজেদেরকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারে।বর্তমানে বাংলাদেশে
ফুটবল ও ক্রিকেট বেশ
জনপ্রিয় এবং উপার্জনের একটা
জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে।উপজেলা ও
জেলা ভিত্তিক বিভিন্ন খেলায় অংশগ্রহণ করে তারা সনদ
অর্জন করছে এবং এই
সনদ তাদেরকে আগামীতে সেনাবাহিনীতে ও ভার্সিটিতে ভর্তি
হতে সহায়ক হতে পারে।সুতরাং,একজন
শারীরিকভাবে সুস্থ কিন্তু পড়াশোনায় দুর্বল - এমন যারা আছে
তারা ক্রীড়াঙ্গনে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করে নিজের ও
এলাকার নাম সুউচ্চে তুলতে
পারে।
আরেকদল
আছে যারা সৃজনশীল কাজে
বেশ আনন্দ উপভোগ করে।তারা আর্ট শিখতে পারে,বিভিন্ন উচ্চারণ একাডেমিতে ভর্তি হয়ে উপস্থাপনা, কবিতা
আবৃত্তি শিখতে পারে।কথা আমরা সবাই বলতে
পারি কিন্তু গুছিয়ে ও সুন্দর, আকর্ষণীয়
শব্দ চয়নে সবাই কথা
বলতে পারি না।বাক চারু
একটা শিল্প আর এ শিল্পে
কিন্তু যথেষ্ট নিজেকে উপস্থাপন করা যায়,সাথে
উপার্জন ও প্রসংশা সব
ই হয়।কিছু শিক্ষার্থী থাকে যারা ইংরেজি
কম পারে বা বোঝে
কিন্তু ইংরেজিতে বেশ ঝোঁক -তারা
কিন্তু বিভিন্ন স্পোকেন কোর্সে ভর্তি হতে পারে।তিন মাসে
তারা ইংরেজি ভালোভাবে শিখলে তাদের এইচএসসি ও পরবর্তীতে ভর্তি
পরীক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।বর্তমান সময়ে যেকোনো স্তরের
পড়ালেখার জন্য ইংরেজি শেখা
খুব ই গুরুত্বপূর্ণ। ইংরেজিতে
কেউ পারফেক্ট হলে সকল কাজের
ও বিদ্যার অর্ধেক সফলতা অর্জিত হয়।ইংরেজিতে কথা বলা -আমাদের
অনেকের স্বপ্ন আর এ তিন
মাসে ইংরেজি ভালোভাবে শিখতে পারলে তাদের সেই স্বপ্ন পূর্ণ
হবে।
আরেক
দল শিক্ষার্থী আছে যাদের কাছে
পাঠ্যক্রমের শিক্ষা খুব ই কঠিন।তারা
ক্লাসে,ক্লাসের পড়ায় এবং পাঠ্যক্রমে
বিরক্ত অনুভব করে,ক্লান্ত হয়ে
বই থেকে দূরে থাকে;
এদের আবার মোবাইল বা
কম্পিউটার বেশ ভালো লাগে!
এরা নিজে নিজে ছবি
এডিটিং করে,ভিডিও তৈরি
করে,অন লাইনে নিজেদের
সেরা প্রতিযোগী ভাবে - এসমস্ত শিক্ষার্থী ফটোশপের কাজ শিখতে পারে,মোবাইল ভিত্তিক ও কম্পিউটার ভিত্তিক
জ্ঞানার্জনে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করতে পারে।বর্তমান বিশ্বে
ফ্রি ল্যান্সিং খুব জনপ্রিয় এবং
ভিডিও এডিটিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কম্পিউটার
শিখে বা মাল্টিমিডিয়ার কাজ
শিখে নিজের কর্ম জীবনে ভালো
করতে পারে।কম্পিউটার দক্ষতা না থাকলে চাকরি
তো পরে,শিক্ষা অর্জনেও
ভোগান্তির শিকার হতে হয়।এই অন
লাইন ভিত্তিক জ্ঞান এসব শিক্ষার্থীর সফলতার
সিঁড়ি হতে পারে। বিখ্যাত
বাউল সম্রাট লালন ফকির বলেন,"
পরের দ্রব্য,পরের নারী হরণ
করো না পাড়ে যেতে
পারবে না" অথচ,শিক্ষা আর
মনুষ্য অর্জনে পরের শিক্ষা বলে কিছু নেই।পরের
বিদ্যা শিখে নিজের পথ
চলা সুগম হবে।
আর যারা পড়ালেখায় ভালো তারা পাঠ্যক্রম বাদেও বই পড়তে পারে।বই পড়ার অভ্যাস কাউকে ঠকায় না।বই হলো সেই তরী যার মাধ্যমে বিশ্ব ভ্রমণ করা যায়।মোবাইল এর রঙিন আলো আমাদেরকে দিনে দিনে বইবিমুখ জাতিতে পরিণত করেছে।বই পড়াকে অনেকে সময়ের অপচয় ভাবে; সময়ের অপচয় ঠিক ই কিন্তু তা জ্ঞানের রাজ্যে নিয়ে যেতে পারে।আলো যেমন জাগতিক নিয়মে অন্ধকার দূর করে সব কিছু মূর্ত করে , তেমনি বই মানুষের মনের ভেতরে জ্ঞানের আলো এনে যাবতীয় অন্ধকারকে দূর করে চেতনার আলোকে সবকিছুকে উদ্ভাসিত করে দেখায়।
আলো
শুধু ভৌগোলিক ভাবে ছড়িয়ে যেতে
পারে। আর বই অতীত
থেকে ভবিষ্যৎ , নিকট থেকে দূরে
, প্রান্ত থেকে অন্তে এমনকি
যুগ থেকে যুগান্তরে জ্ঞানের
আলোকে পৌঁছে দিতে পারে ।
তাই দেশ কালের সীমানা
অতিক্রম করে জ্ঞানের আলোকে
মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারে একমাত্র
বই । শ্রেষ্ঠ শিক্ষা
হল আত্মশিখন । আর বই
সেই আত্মশিখনের শ্রেষ্ঠ সহায়ক । বিনোদন থেকে
শিক্ষা , অবসর যাপন থেকে
নিঃসঙ্গতা দূর — সবকিছুতেই বই শ্রেষ্ঠ অবলম্বন
হতে পারে । আর্নেস্ট
হেমিংওয়ে বলেন,”বইয়ের মত এত বিশ্বস্ত
বন্ধু আর নেই।" অথচ,আজকের ফোনের যুগে আমরা সেই
বন্ধু থেকে অনেক দূরে।
মার্ক টোয়েন বই সম্পর্কে বলেন,
”ভালো বন্ধু, ভালো বই এবং
একটি শান্ত বিবেক; এটি আদর্শ জীবন।“
আদর্শ জীবনের অংশ হিসাবেও আমাদেরকে
বই পড়া উচিত।
প্রিয়
শিক্ষার্থীরা,তোমরা নিজেদের মেধা ও পারিবারিক
পরিবেশ ও অবস্থা বিবেচনায়
আজকের যেকোনো পরামর্শ গ্রহণ করে এগিয়ে যেতে
পারো।তবু নষ্ট সমাজের ক্রীড়নক
হয়ে বড় হতে শিখো
না।তুমি নষ্ট মানে তোমার
পরিবারের কষ্ট আর তোমার
সব নষ্ট আচরণ সমাজ
ও রাষ্ট্রের উপরে নেতিবাচক প্রভাব
ফেলবে। শেষে শুধু এতটুকু
বলতে পারি," আমাদের শিক্ষার্থী আমাদের ভুবন, আলোকিত হোক তাদের নিজের
জীবন।"