ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ২৭ Jul ২০২৬,  ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ, আয় হতে পারে ৬৩.৪ বিলিয়ন ডলার রাজধানীতে ১৮ মন্ত্রী চলবেন এসকর্ট ছাড়া, বহাল থাকছে ৭ জনের সুবিধা সাতক্ষীরায় অপরিকল্পিত মৎস্য ঘের: পানিবন্দী হাজারও মানুষ, সড়ক-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত সাতক্ষীরার তিন হাসপাতালে হঠাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রী, অনুপস্থিত দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট দল ঘোষণা, নেই নাহিদ-লিটন সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি হোক মেধা ও যোগ্যতায়: প্রধানমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১১৬০ জামায়াত জোট ছাড়ার গুঞ্জন নাকচ করল নেজামে ইসলাম চলনবিলে অবাধে ব্যবহার হচ্ছে নিষিদ্ধ চায়নাদুয়ারী জাল লক্ষ্মীপুরে উৎসবমুখর পরিবেশে ধারণ হলো ‘ইত্যাদি’র বিশেষ পর্ব

দুখু মিয়া থেকে জাতীয় কবি হওয়ার গল্প


  • আপলোড সময় : শনিবার ২৪ মে, ২০২৫ সময় : ৮:০৩ পিএম

মামুনার রশীদ,বগুড়া

বাংলাদেশের বিতর্কিত সমালোচিত লেখক হুমায়ূন আজাদ তাঁর এক লেখায় বলেছিলেন " জন্ম আমার আজন্ম পাপ" কিন্তু আমার জাতীয় কবি,চির-বিদ্রোহী খ্যাত কাজী নজরুল তাঁর কর্ম চিন্তা দিয়ে তাঁর সেই আবেগী বচন ভুল প্রমাণ করেছেন। ১৯২৬ সালে নভেম্বর মাসে কবি তাঁর বন্ধু মুজফফর আহমদকে দারিদ্র্যের পাণ্ডুলিপিটা হাতে দিয়ে বলেছিলেন," দিনেশরঞ্জন দাশ মানিঅর্ডারযোগে দশটি টাকা পাঠিয়েছিলেন এবং একটি কবিতাও চেয়েছিলেন। এই কবিতাটি আমি বড় দুঃখে লিখেছি।" হ্যাঁ,সত্যি তাই।কবি তাঁর দারিদ্র্য কবিতায় বললেন,

" হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছো মহান

তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রিস্টের সম্মান

কণ্টক-মুকুট শোভা,দিয়াছ তাপস

অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস।"

 

দুখু মিয়ার দারিদ্র্য নিয়ে কোনো ভয় ছিল না।শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সঙ্কোচহীনভাবে লিখে গেছেন যতদিন সুস্থ ছিলেন।যেখানে আমরা আমাদের দারিদ্র্য নিয়ে লজ্জিত, শঙ্কিত আর দ্বিধায় থাকি সেখানে কাজী নজরুল বললেন," হে দারিদ্র্য তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রিস্টের সম্মান।" এই সহজ সরল স্বীকারোক্তি তাঁকে বাংলাদেশের ইতিহাসে মহান করে রেখেছে।দারিদ্র্য তিনি ভয় নয় বরং জয় করেছেন এবং সেই দারিদ্র্যের মহান পুরুষ আজও তাঁর মৃত্যুর পরে আমাদের জাতীয় জীবনে প্রভাবিত চরিত্র হিসেবে আছেন।দারিদ্র্যের এই বিশ্ব সংসারে কাজী নজরুল ১৩০৬ বঙ্গাব্দে, ১১ জ্যৈষ্ঠ,মঙ্গলবার, ২৪ মে,১৮৯৯ সালে বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বাঙালি কবি হিসেবে আবির্ভূত হোন।

তাঁর জন্ম পাপ নয় বরং তাঁর জন্ম ছিল চির উন্নত মম শির আর বিদ্রোহের ঝংকার তোলা মুক্তিকামী মানুষের সোনালি দিনের বার্তা।মাত্র বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে ১৯১২ সালে স্কুল ত্যাগ করতে বাধ্য হোন।তারপর বাসুদেবের কবিদলের সাথে সম্পর্ক,রেলওয়ে গার্ড সাহেবের খানসামা,আসানসোলে এম বখ্শের চা-রুটির দোকানে চাকরি,আসানসোহে পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর ময়মনসিংহের কাজী রফিজউল্লাহ তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী শামসুন্নেসা খানমের স্নেহ লাভ করে দরিরামপুর স্কুলে সপ্তাহ শ্রেণিতে ভর্তি হোন।সেই থেকে বাংলাদেশে আসা শুরু।

 

তিনি তাঁর জীবদ্দশায় বর্তমান বাংলাদেশের  মোট ২৬ টি জেলায় বিভিন্ন কারণে সফর করেন।প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরে তিনি ১৯২০ সালে পূর্ববঙ্গ প্রথম সফর করেন।তখন তাঁর সফর সঙ্গী ছিলেন শেরে বাংলা কে ফজলুল হক।সর্ব শেষ তিনি বাংলাদেশেে আসেন ১৯৭২ সালে।২৪ মে,১৯৭২ সালে সে সময় তিনি বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে সপরিবারে ঢাকায় আসেন এবং আমৃত্যু তিনি ধানমন্ডিতে বসবাস করেন।

 

১০ ডিসেম্বর, ১৯২৯ সালে অবিভক্ত ভারতের কলকাতার এলবার্ট হলে বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু,বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়,এস ওয়াজেদ আলী, দীনেশচন্দ্র দাশসহ বহুবরেণ্য ব্যক্তিগণের উপস্থিতিতে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে ' জাতীয় কাণ্ডারী' এবং ' জাতীয় কবি ' হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়।বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ১৯৭২ সালে কবিকে সরকারিভাবে ঢাকায় আনা হয় এবং বঙ্গভবনে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে অভিহিত করেন।

 

কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো ১৯৭৬ সালে ২৯ আগষ্ট কবির মৃত্যুর সময়ও,এমন করি তারপরেও পাঁচ দশক অতিবাহিত হলেও তাঁকে জাতীয় কবির সরকারি স্বীকৃতি ছিল না তবে ততদিনে তিনি দুখু মিয়া থেকে জনমনে জাতীয় কবির স্থায়ী স্থান লাভ করে ফেলেন। অবশেষে জুলাই-আগষ্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে নতুন অন্তর্বর্তী সরকার এসে ডিসেম্বর, ২০২৪ সালে কবিকে জাতীয় কবির স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।ড.মুহাম্মদ ইউনূস এর নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৪ কবি নজরুলকে জাতীয় কবি হিসেবে প্রজ্ঞাপন জারি করে এবং পরবর্তীতে ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৪ সালে সেই প্রজ্ঞাপন গেজেট আকারে প্রকাশ পায় আর এখন তিনি মানুষের মন থেকে সনদে বাংলাদেশের জাতীয় কবি।মৃত্যুর ৪৮ বছর পরে পৃথিবীর কোনো সাহিত্যিকের কপালে এমন স্বীকৃতি আসছে কি না -তা আলোচ্য বিষয়।

আমাদের দুখু মিয়া এখন আমাদের জাতীয় কবি।তবে তাঁর আরও পরিচয় আছে।তিনি তাঁর ক্ষুরধার লেখনী দ্বারা সবার কাছে বিদ্রোহী কবি নামে খ্যাত।২২ অক্টোবর, ১৯২২ সালে তাঁর বিখ্যাত কবিতা ' বিদ্রোহী' ধূমকেতু পত্রিকায় প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়ার পরে  প্রমথ চৌধুরী তাঁকে বিদ্রোহী কবি হিসেবে উপাধি দেন।কবিবন্ধু, গবেষক মুজফফর আহমদ তাঁর কাজী নজরুল স্মৃতি কথা নামক বইয়ে বলেন," আমি বিদ্রোহী কবিতার প্রথম শ্রোতা।" তিনি আরও বলেন," ১৯২১ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে কবি বিদ্রোহী কবিতাটি লেখেন।" সেই কবিতা তিনি শুরু করেন এভাবে,

" বল বীর,

বল চির উন্নত মম শির!

শির নেহারি' আমারি নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির!

 

কবির মাথা,কবির মর্যাদা দারিদ্র্যের জন্য,তাঁর অজাল অসুস্থতার জন্য কিম্বা কোনো নিপীড়কের কাছে নত হয়নি বলেই তিনি তাঁর মৃত্যুর পাঁচ দশক পরেও বাঙালির মনে,চিন্তায় কর্মে সপ্রতিভ এক মহান আদর্শিক চরিত্র হিসেবে আছেন।এতদিন পরে জাতীয় কবির স্বীকৃতি তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।কবি তাঁর অভিশাপ কবিতায় বলে গেলেন,

" যেদিন আমি হারিয়ে যাব,বুঝবে সেদিন বুঝবে

অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুছবে।"

মানুষ কাজী নজরুল মরে যেতে পারেন কিন্তু তাঁর চিন্তা, অনুপ্রেরণা, সাহস আর সঞ্জীবনী শক্তি কভু মরবে না,হারিয়ে যাবে না।কিছু কিছু মানুষ মৃত্যুর পরে আরও শক্তিশালী হয়ে,মর্যাদাবান হয়ে পৃথিবীতে মানুষের মনে রাজ করেন- নজরুল তাঁদের অন্যতম।এখনকার রাজনৈতিক কবিদের ভিড়ে, ক্রীড়নক কবিদের ভিড়ে, ব্যবসায়ী কবিদের ভিড়ে কেবল কাজী নজরুল ইসলামকেই মনে হয়।তিনি তাঁর ব্যথা-নিশীথ কবিতসয় বলে গেলেন," এই নীরব নিশীথ রাতে শুধু জল আসে আঁখিপাতে" আজও মিছিলে, সংগ্রামে,বিরহে কিম্বা প্রেমে কেবলি নজরুলকেই ভাবি।

১৯২৩ সালে জানুয়ারি কাজী নজরুল ইসলাম প্রেসিডেন্সী জেল,কলকাতায় তাঁর রাজবন্দীর জবানবন্দী দিতে গিয়ে বলেন," একধারে রাজার মুকুট; আরেক ধারে ধূমকেতুর শিখা।একজন রাজা,হাতে রাজদণ্ড; আরেকজন সত্য,হাতে ন্যায়দণ্ড।রাজার পক্ষে নিযুক্ত রাজবেতনভোগী রাজকর্মচারী, আমার পক্ষে সকল রাজার রাজা,সকল বিচারকের বিচারক,আদি অন্তকাল ধরে সত্য- জাগ্রত ভগবান।" তিনি বেঁচে আছেন দারিদ্র্যের পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মনীষী হয়ে।আজ নজরুল জয়ন্তীতে কবিকে স্মরণ করি তাঁর সাম্যের চিন্তায় অসাম্প্রদায়িক চেতনার জন্য।

আকাশজমিন/আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর