লালমনিরহাট প্রতিনিধি / : 168
লালমনিরহাট প্রতিনিধি
লালমনিরহাটে টানা চার দিন পরে বন্যার পানি নেমে গেলে ভেসে উঠে ক্ষত। বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও দুর্ভোগ বেড়েছে লালমনিরহাটের তিস্তাপাড়ে। রোপা আমন খেত পঁচে গলে নষ্ট হওয়ায় দুঃচিন্তার ভাঁজ পড়েছে তিস্তাপাড়ের কৃষকদের কপালে। জানা গেছে, উজানের ঢল ও টানা ভারি বৃষ্টিতে হু হু করে বাড়ে তিস্তা নদীর পানি প্রবাহ। গেল সোমবার রাতে ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি প্রবাহ বিপদসীমা অতিক্রম করে।
মঙ্গলবার সকাল থেকে বন্যায় প্লাবিত হয় তিস্তা নদীর বাম তীরের জেলা লালমনিরহাটের ৫টি উপজেলা অধিকাংশ এলাকা। টানা চার দিনের বন্যায় ডুবে যায় নদী তীরবর্তি অঞ্চলের ফসলি খেত। পানিবন্দি হয়ে পড়ে জেলার প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানি তোরে ভেসে গেছে মৎস চাষিদের পুকুরের মাছ। বিশেষ করে আমন খেত ও বীজতলা ডুবে যাওয়ায় কৃষিতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে তিস্তাপাড়ে। শুক্রবার পানি কমে গেলে জেগে উঠে বন্যার ক্ষত।
আমনের
লাগানো চারা বন্যার পানিতে পঁচে গলে নষ্ট হয়েছে। অধিকাংশ খেতে শুধু মাটি বালু পড়ে রয়েছে,
নেই কোন আমনের চারা। কিছু খেতে চারা গাছ দেখা গেলেও শনিবার (১৬ আগসট) প্রচণ্ড রোদে তা গলে পঁচে নষ্ট হচ্ছে।
মাত্র এক সপ্তাহ আগে দ্বিতীয় দফার বন্যায় নষ্ট হওয়া আমন খেতে নতুন করে চারা লাগান নদী
পাড়ের কৃষকরা। সেটাও তৃতীয় দফার বন্যায় ৩/৪ দিন ডুবে থেকে নষ্ট হয়েছে। নতুন করে লাগানোর
মত চারা নেই অধিকাংশ চাষির। ফলে আমন নিয়ে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে তিস্তাপাড়ের চাষিদের
কপালে।
টানা
তিন/চার দিন পর বাড়ি ঘর থেকে বন্যার পানি নেমে গেলেও দুর্ভোগ কমেনি নদীপাড়ে। পানির
তোড়ে নষ্ট হওয়া ঘর বাড়ি বেড়া মেরামত করছেন। বন্যার পানির সাথে ভেসে আসা ময়লা আবর্জনা
ডুকে পড়েছে প্রতিটি বাড়িতে। ঝোপ ঝাড়ে আশ্রয় নিয়ে সাপ পোকামাকড়। এসব সংস্কার করতে ব্যস্থ
সময় যাচ্ছে পানিবন্দি পরিবারগুলো। বন্যার পানিতে অনেকের গুরুত্বপুর্ন জিনিস পত্র ভিজে
নষ্ট হয়েছে। বন্যার পানিতে ডুবে নষ্ট হয়েছে নদীপাড়ের বেশ কিছু বিদ্যালয়ের আসবাবপত্র।
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর জানায়, তৃতীয় দফার বন্যায় জেলার ৯১৫ হেক্টর জমির আমন খেতে ও ৬৩ হেক্টর জমির অন্যান্য ফসল নিমজ্জিত হয়েছে। যার সামান্য কিছু নষ্ট হলেও নতুন করে রোপন করার সময় রয়েছে।
তবে
কৃষি বিভাগে এ তথ্য সানতে নারাজ স্থানীয় চাষিরা। তাদের মতে, শুধু নদী পাড়ে বন্যায় ফসল
খেত ডুবে নি। টানা ভারি বৃষ্টিতে সারা জেলার নিম্নাঞ্চলের খেত ডুবেছে। পানিতে তলিয়ে
আছে ৪-৫ দিন ধরে। ফলে কৃষিতে ক্ষতির পরিমান অনেক বেশি বলে দাবি চাষিদের।
আদীতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের কৃষক
ফরিদ মিয়া বলেন, আমরা অনেক কষ্ট করে চাষাবাদ করি। কিছুদিন আগে একবার বন্যায়
ডুবে গিয়ে আমার ২ বিঘা জমির আমন ধান নষ্ট হয়েছিল। চারা ক্রয় করে দ্বিতীয় দফায় রোপন
করেছিলাম। সেটাও এক সপ্তাহের ব্যবধানের বন্যার পানিতে ডুবে নষ্ট হলো। এখন চারা কেনার
টাকাও নেই। চারা রোপন না করলে পরিবার খাবে কি? আমরা কীভাবে বাঁচবো জানি না।
খুনিয়াগাছ
ইউনিয়নের মাষ্টারপাড়ার কেয়া রানী বলেন, কয়েক দিন ধরে পানিবন্দি অবস্থায় আছি। আজকে পানি
কিছুটা কমলেও কষ্ট করে খালি পায়ে প্রাইভেটে যাচ্ছি। ত্রাণ নয়, আমাদের তিস্তার স্থায়ী
সমাধান চাই। পানিবন্দি
ফরিদা বেগম বলেন, পানি ঢুকে পড়ায় চুলা জ্বালানো
সম্ভব হয়নি। গবাদিপশু ও পরিবারের লোকদের নিয়ে রাস্তায় আশ্রয় নিতে হয়েছিল।
তিস্তা পাড়ের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, তিস্তা আমাদের সর্বনাশ করে দিয়েছে। বছরের পর বছর চাষাবাদে অনেক খরচ করেও আমরা লাভবান হতে পারি না। যা আবাদ করি, ঠিকমতো তার দাম পাই না। কিন্তু এবারের বন্যায় আমাদের সবকিছু শেষ করে দিলো। শনিবার তিস্তা নদীর পানি ডালিয়া পয়েন্টে দিনভর বিপদসীমার নিচে প্রবাহিত হয়। ফলে লালমনিরহাটে বন্যা পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। তিস্তা নদীতে পানি কমে যাওয়ায় বেড়ে ভাঙন। তিস্তা নদীর বাম তীরে বেশ কয়েকটি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। কালীগঞ্জে দক্ষিণ ভোটমারী, হাতীবান্ধার সিন্দুর্না এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর পরিচালক ড. সাইখুল আরিফিন বলেন, বন্যার পানিতে ডুবে থাকায় আমন খেত সামান্য কিছু ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তবে নদীপাড়ের চাষিরা বন্যা কালিন আপদের জন্য উচু এলাকায় আমনের বলান করে রাখেন। পানি নেমে গেছে নষ্ট হওয়া খেতে সেই আমনের বলান করা চারা রোপণ করতে চাষিদের প্রতি পরামর্শদেন তিনি। আমনের চারা রোপণের এখনও সময় রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি
পানি উন্নয়ন বোর্ড লালমনিরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী শুনীল কুমার বলেন, তিস্তা নদীর পানি কমে যাওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। পানিবন্দি পরিবারগুলোর মুক্তি মিলেছে। পানি কমলে নদীতে ভাঙন দেখা দেয়। সেদিক থেকে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে নদীপাড়ে।
আকাশজমিন/আরআর