আব্দুস সালাম, দিনাজপুর
দিনাজপুর
জেলার সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা এক চরম সংকটের
মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জেলার
১,৮৬৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৯৩৮টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। অর্থাৎ,
অর্ধেকেরও বেশি বিদ্যালয় চলছে
স্থায়ী প্রধান শিক্ষক ছাড়া। এই অব্যবস্থা দীর্ঘদিনের
পদোন্নতি ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার
স্থবিরতার ফল।
জেলা
প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, দিনাজপুরের
১৩টি উপজেলার প্রতিটিতেই প্রধান শিক্ষকের সংকট রয়েছে। এর
মধ্যে কিছু উপজেলায় পরিস্থিতি
অত্যন্ত উদ্বেগজনক। চিরিরবন্দর উপজেলার ১৯৯টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১১৫টিতে, বীরগঞ্জে ২৩০টির মধ্যে ১১৮টিতে এবং পার্বতীপুরে ২০৬টির
মধ্যে ১০৫টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ খালি। এমনকি
সদর উপজেলাতেও ১৮৬টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫৪টি প্রধান শিক্ষকশূন্য
অবস্থায় চলছে।
প্রধান
শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে
একটি নির্ধারিত নীতিমালা রয়েছে—যেখানে ৬৫ শতাংশ পদোন্নতির
মাধ্যমে এবং ৩৫ শতাংশ
সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পদ পূরণের বিধান
আছে। কিন্তু ২০০৯ সাল থেকে
চলমান একটি মামলার কারণে
আদালতের নিষেধাজ্ঞায় পদোন্নতি প্রক্রিয়া বন্ধ রয়েছে। একই
সঙ্গে, নতুন নিয়োগও দীর্ঘদিন
ধরে স্থগিত থাকায় সংকট আরও গভীর
হয়েছে। ফলে বহু প্রধান
শিক্ষক অবসর নিয়েছেন, কিন্তু
তাদের পরিবর্তে কাউকে নিয়োগ দেওয়া যায়নি। অন্যদিকে, সহকারী শিক্ষকদের দীর্ঘ অপেক্ষা আর প্রাপ্য পদোন্নতি
না পাওয়ায় তারা চরম হতাশায়
ভুগছেন।
বাংলাদেশ
প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির দিনাজপুর জেলা শাখার আহবায়ক
কমিটির সদস্য সচিব মো. মতিয়ার
রহমান বলেন, দীর্ঘ দুই দশকের চাকরিজীবনেও
অনেক শিক্ষক পদোন্নতি পাননি। নতুন করে নিয়োগ
বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করায় তাঁদের মধ্যে
ক্ষোভ আরও বেড়েছে। তাঁদের
দাবি, অবিলম্বে নিয়োগ বন্ধ করে জ্যেষ্ঠতার
ভিত্তিতে শতভাগ পদোন্নতি দেওয়া হোক।
বর্তমানে
অনেক বিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকরা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু
সহকর্মীরা একই পদমর্যাদার হওয়ায়
তাদের নির্দেশনাকে গুরুত্ব দিতে অনীহা প্রকাশ
করেন। এতে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা
নষ্ট হচ্ছে এবং পাঠদান কার্যক্রমে
ব্যাঘাত ঘটছে। সদর উপজেলার উত্তর
গোবিন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. গোলাম ফারুক
জানান, প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও প্রাতিষ্ঠানিক
কর্তৃত্বের অভাবে কাজ করতে গিয়ে
নানা জটিলতায় পড়তে হয়।
পুলহাট
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জাকির হোসেন
মনে করেন, প্রধান শিক্ষকের অনুপস্থিতি শুধুই প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি সরাসরি
পাঠদানে প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে পঞ্চম শ্রেণির
বৃত্তি পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্লাসগুলো
ঠিকমতো পরিচালিত হচ্ছে না। এতে শিক্ষার্থীদের
পড়ালেখা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং সার্বিকভাবে শিক্ষার
মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সদর
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি এটিএম তোফায়েল হোসেনও এই অবস্থাকে গভীর
উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন।
অভিভাবকরাও এই পরিস্থিতি নিয়ে
উদ্বিগ্ন। একজন অভিভাবক লিজা
আক্তার বলেন, বিদ্যালয়ে শিক্ষক কম থাকায় ক্লাস
ঠিকমতো হয় না, এতে
শিশুদের পড়াশোনায় বড় ধরণের ঘাটতি
তৈরি হচ্ছে। তিনি দ্রুত শিক্ষক-স্বল্পতা দূর করার আহ্বান
জানান।
দিনাজপুর
জেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. সাইফুজ্জামান জানান,
যেহেতু আদালতের নিষেধাজ্ঞা এখনও বহাল রয়েছে,
তাই সারা দেশেই পদোন্নতি
দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে মামলার
নিষ্পত্তি হলে দ্রুত পদোন্নতির
মাধ্যমে শূন্যপদ পূরণের আশা প্রকাশ করেন
তিনি। তার ভাষায়, জেলা
শিক্ষা অফিস শিক্ষার মান
রক্ষায় সম্ভাব্য সব ধরনের উদ্যোগ
নিচ্ছে।
তবে
স্থানীয় শিক্ষাবিদ, শিক্ষক ও অভিভাবকেরা মনে
করেন, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে দিনাজপুর
জেলার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা আরও বড় সংকটে
পড়বে। তাই সময়ক্ষেপণ না
করে, আইনি জটিলতা দ্রুত
সমাধান করে, জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে
প্রধান শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির ব্যবস্থা
গ্রহণ করাই এখন সবচেয়ে
জরুরি।
আকাশজমিন/আরআর