ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের বিকল্প নেই: ড. আবদুল মঈন খান স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা নেই: মীর শাহে আলম দুপুরের মধ্যেই বিদ্যুৎ পাচ্ছে বাংলাদেশ: কমবে লোডশেডিং এমপিও শিক্ষকদের নির্বাচন ভাগ্য নির্ধারণ করবে ইসি: মীর শাহে আলম সরকারি কেনাকাটায় পুকুরচুরি ঠেকাতে আসছে অভিন্ন একক দরতালিকা সাগর-রুনি হত্যার বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ

উত্তরের স্বপ্নযাত্রা: বগুড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পথচলা


  • আপলোড সময় : রবিবার ০৫ অক্টোবর, ২০২৫ সময় : ৩:৩১ পিএম


. মো: শিবলুর রাহমান

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে উত্তরবঙ্গের প্রাণকেন্দ্র বগুড়ায় অবশেষে কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে বগুড়া বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের। বগুড়ার মাটিতে বেড়ে ওঠা মানুষ হিসেবে এই প্রাপ্তি আমাদের জন্য অত্যন্ত আবেগ গর্বের। গত ০৪ জুন ২০২৫ তারিখে অন্তর্র্বতী সরকার যখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক কুদরত--জাহানকে নিয়োগ দিয়েছে, তখন আমাদের স্বপ্নগুলো যেন এক নতুন প্রাণ পেয়েছে।

বগুড়ার মানুষ হিসেবে আমরা শুধু এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নিছক দর্শক নই, আমরা এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন। তাই এই স্বপ্নের সফল বাস্তবায়নে আমাদেরও কিছু দায়িত্ব কর্তব্য রয়েছে। আমি নিজে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং বিশ্বের অন্যতম উন্নত দেশ জাপান আমেরিকায় উচ্চশিক্ষা, গবেষণা প্রশিক্ষণ নেয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। তাই জাপান আমেরিকায় উচ্চশিক্ষা এবং গবেষণাকালে অর্জিত অভিজ্ঞতার আলোকে, আমাদের প্রাণের প্রতিষ্ঠান বগুড়া বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি বিশ্বমানের রূপে গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমি কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরতে চাই

 

একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়কে সফল করতে হলে শুরু থেকেই কিছু মৌলিক বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হয়। আমার মতে, প্রথম প্রধান করণীয় হলো একটি সুদূরপ্রসারী মহাপরিকল্পনা  প্রণয়ন করা এবং পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সেটি মেনে চলা। আগামী ৫০ বছরের একটি রোডম্যাপ ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ থেকে শুরু করে একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে অপরিকল্পিত উন্নয়ন এড়িয়ে পরিবেশবান্ধব টেকসই উন্নয়ন করা সম্ভব।

 আমি মনে করি, একটি বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার জন্য এর ভিত্তি হতে হবে চারটি প্রধান স্তম্ভের উপর: () মেধাবী শিক্ষক গবেষণা, () শিক্ষার্থী যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম, () বিশ্বমানের অবকাঠামো এবং () সংযোগ সুশাসন।

 জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দু: শিক্ষক, গবেষণা পাঠ্যক্রম

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণশক্তি তার শিক্ষক গবেষণার মান। কোনো প্রকার আপোস ছাড়া, শুধুমাত্র যোগ্যতা অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দেশ-বিদেশের অভিজ্ঞ শিক্ষক গবেষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এর পাশাপাশি, শুরু থেকেই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতির চর্চা করতে হবে। শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে এবং শিক্ষার্থী নির্বাচনে বৈচিত্র্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মেধাবীদের আকৃষ্ট করার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি সত্যিকারের এক জাতীয় প্রতিষ্ঠানে রূপ নেবে, যা শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করবে।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের গবেষণার মানকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা  শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করতে হবে। উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে আন্তঃবিষয়ক  শিক্ষার প্রসারে।

পাঠ্যক্রম হতে হবে আধুনিক প্রায়োগিক। বগুড়ার কৃষি ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে প্রিসিশন এগ্রিকালচার, স্মার্ট ফার্মিং ফুড টেকনোলজির মতো বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এর পাশাপাশি চতুর্থ শিল্পবিপ¬বের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (অও), ডেটা সায়েন্স, বায়ো মেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং, জনস্বাস্থ্য পরিবেশ বিজ্ঞান-এর মতো যুগোপযোগী ফলিত  বিষয় খুলতে হবে। আমাদের লক্ষ্য হবে আকর্ষণীয় ক্লাসরুম  তৈরি করা এবং এমন সহজ আনন্দময় শিক্ষা কার্যক্রমকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞানের প্রতি অদম্য আগ্রহ তৈরি করে।

 বিশ্বমানের ক্যাম্পাস: অবকাঠামো সুযোগ-সুবিধা

শিক্ষার্থীদের মেধা মননের পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য একটি শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাস অপরিহার্য। একাডেমিক ভবনের পাশাপাশি যাত্রা শুরুর দিন থেকেই শিক্ষার্থীদের জন্য সহশিক্ষা কার্যক্রমকে প্রাধান্য দিতে হবে শিক্ষার্থীদেরকে বিভিন্ন ক্লাব, সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহ প্রদান করতে হবে। কারণ, এতে করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলীসফ্ট স্কিল, সমাজ রাষ্ট্রের  প্রতি দায়বদ্ধতা দায়িত্ববোধ তৈরি হবে একটি সমৃদ্ধ কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি, আধুনিক ল্যাবরেটরি, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র, খেলার মাঠ এবং জিমনেসিয়ামের মতো অবকাঠামো নির্মাণে মনোযোগ দিতে হবে। আনন্দময় ক্যাম্পাসই পারে শিক্ষার্থীদের মেধার সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটাতে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের Í হলো তার লাইব্রেরি। একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে পর্যাপ্ত বইয়ের পাশাপাশি বিশ্বের সেরা জার্নালগুলোর সাবস্ক্রিপশন একটি শক্তিশালী ডিজিটাল লাইব্রেরি থাকবে। সকল শিক্ষার্থীর জন্য সার্বক্ষণিক কম্পিউটার ইন্টারনেট অ্যাক্সেস নিশ্চিত করাও বিশ্বমানের শিক্ষার অন্যতম শর্ত।

 সংযোগ, স্বনির্ভরতা ভবিষ্যৎ

একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হতে হয়। ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবোরেশন বা শিল্প-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্নশিপ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। এর মাধ্যমে কমিউনিটি সম্পৃক্ততা  বাড়বে এবং বিশ্ববিদ্যালয় স্থানীয় অর্থনীতিতে সরাসরি অবদান রাখতে পারবে।

সরকারি অনুদানের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আয়ের উৎস তৈরি করাটাও জরুরি। ক্যাম্পাসে দোকান বরাদ্দ, বিভিন্ন কর্মমুখী প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করা, এবং একটি কেন্দ্রীয় ল্যাবরেটরি থেকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বিভিন্ন পরীক্ষার সুযোগ করে দেওয়ার মাধ্যমে আর্থিক স্বনির্ভরতা অর্জন করা সম্ভব। এর সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যান্ডিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিজস্ব মনোগ্রাম সংবলিত টি-শার্ট, মগ, খাতা, কলম, ব্যাগ ইত্যাদির জন্য একটি স্যুভেনিয়ার শপ খোলা যেতে পারে, যা প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি বাড়ানোর পাশাপাশি আয়েরও উৎস হবে।

আমি মনে করি, প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা একটি দূরদর্শী পদক্ষেপ। প্রথম ব্যাচ থেকেই একটি শক্তিশালী অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন গঠন করতে হবে। কোন শিক্ষার্থী কোথায় কর্মরত আছেন, তার একটি সুসংগঠিত ডেটাবেস বা ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করতে হবে। এই অ্যালামনাইরাই হবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ দূত এবং শক্তির অন্যতম উৎস। এর মাধ্যমে প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা বর্তমান শিক্ষার্থীদের গাইড করতে পারবেন, ফান্ডিং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

সবশেষে, এই মহাযজ্ঞের সফল বাস্তবায়ন শুধু উপাচার্য বা প্রশাসনের একার পক্ষে সম্ভব নয়। বগুড়ার শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, সকল পেশাজীবী, এবং সাধারণ মানুষসহ সকল অংশীজনের সম্মিলিত সমর্থন গঠনমূলক পরামর্শ বিশ্ববিদ্যালয়কে তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করবে।


আমরা অধ্যাপক কুদরত--জাহানের নেতৃত্বে একটি স্বর্ণোজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি। আসুন, আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা সুচিন্তিত পরিকল্পনার মাধ্যমে বগুড়া বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু দেশের নয়, বিশ্বের বুকে একটি প্রথম সারির প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলি। এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

 

নোয়াখালী বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

 এবং ভিজিটিং স্কলার, স্যাম হিউস্টন স্টেট ইউনিভার্সিটি, আমেরিকা

  জিচি মেডিকেল ইউনিভার্সিটি, জাপান।

 আকাশজমিন / আরআর 




এ সম্পর্কিত আরো খবর