রফিকুল ইসলাম রাজু
শোক আর ক্ষোভে বুকটা যেন পাথর হয়ে যায়। এই অনুভূতিটা সামান্য সময়ের মধ্যেই আমাদের দৈনন্দিন সংবাদপত্রের পাতায় আবারো ফিরে আসে। সম্প্রতি মেট্রোরেলের একটি পিলারের বিয়ারিং প্যাড খুলে এক সাধারণ পথচারী আবুল কালামের প্রাণ হারানো সেই অনুভূতির এক কেঁপে ওঠা উদাহরণ। আবুল কালাম—যিনি শুধু চলছিলেন ফুটপাথে, তাঁর অপরাধ ছিল কি সত্যিই কোনো ধরনের ‘অপরাধ’? আর তাঁর ছোট্ট সন্তানরা, বাবাহারা হয়ে যাওয়া, কেবল এক ক্ষণিকের শোকের বিষয় কি? না কি এটি রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার ধারাবাহিক কাঠামোগত হত্যাকাণ্ডের প্রতিফলন?
এ ঘটনায় আমরা শুধু এক জীবন হারানো দেখিনি, আমরা দেখেছি একটি বৃহৎ সিস্টেমের ব্যর্থতা, যেখানে নিরাপত্তার নামমাত্রই কোন বাস্তব ব্যবস্থা নেই। খামারবাড়িতে আগে এমন বিয়ারিং প্যাড খুলে রাখা হয়েছিল, কিন্তু যেহেতু কেউ মারা যায়নি, তাই যেন কোনো শিক্ষা নেওয়া হয়নি। নিয়মিত তদারকি, নিরাপত্তা প্রতিবেদন—এসব সংস্থাগুলো ছিল কি বাস্তবেই কার্যকর? নাকি এগুলো শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ? পাঁচ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিয়েই দায় শেষ মনে করা হয়। কিন্তু, ক্ষতিপূরণ কি হারানো মানুষের জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে?
ঢাকার ঘটনা প্রথম নয়, শেষও নয়। মগবাজার, সিদ্ধেশ্বরী, মহাখালী, উত্তরার নানা প্রান্তে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে। কোথাও রড পড়ে প্রাণহানি, কোথাও স্টিল প্লেট বা ইটের ধাক্কায়। মানুষ কেবল সংখ্যা হিসেবে বৃদ্ধি পায় ‘দুর্ঘটনার খাতায়’। মিরপুরে আগুনে মানুষের দেহ চেনাই যায়নি। বেইলি রোডে খেতে গিয়ে ৪৬ জনের প্রাণ ঝরে গেছে। মাইলস্টোনে শিশু মারা গেছে। হাসপাতালের সাধারণ প্রসেসে, যেমন সুন্নতে খতনা বা এন্ডোসকপি করাতে গিয়ে জীবন শেষ হয়েছে। বাসে, ট্রেনে, ভবনে, কারখানায়, এমনকি স্কুলে—প্রাণ হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ, নির্দোষ মানুষ।
এই প্রতিটি ঘটনার পরই আমরা শুনি, ফিটনেস নেই, অনুমোদন নেই, সেফটি নেই। অথচ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো যেন ঘুমিয়ে থাকে—ঘুম আর দুর্নীতির মোড়কে মোড়া সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর গুণাবলী। ৫৪ বছর ধরে এই একই গল্প। তদন্ত কমিটি হয়, আলোচনায় কিছুদিন কান্না থাকে, তারপর আবার শুরু হয় ‘পরবর্তী দুর্ঘটনার’ অপেক্ষা।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কতকাল এভাবে চলবে? আর কত লাশ চাই আপনাদের হুঁশ ফেরাতে? বাংলাদেশের শহরগুলো—যেখানে মেট্রোরেল, ট্রাফিক, অবকাঠামো, হাসপাতাল—সবই উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায়, সেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার? উন্নয়ন শুধু লোহার কাঠামো, ব্রিজ বা দালান নয়। উন্নয়ন মানে জবাবদিহিতা, মানদণ্ড অনুযায়ী কাজ, এবং সুশাসনের নিশ্চয়তা।
আমাদের রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট দপ্তরগুলোর দায়িত্ব আছে—পরিকল্পনা করা, বাস্তবায়ন তদারকি করা এবং প্রতিটি প্রজেক্টে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু আমরা যা দেখছি, তা হলো একটি শৃঙ্খলাহীন ব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি দুর্নীতি, অবহেলা ও উদাসীনতা সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে।
ঢাকার মগবাজার, সিদ্ধেশ্বরী বা উত্তরায় দেখা যায়, বহুতল ভবনের নির্মাণকালীন নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব, রাস্তা নির্মাণে অনুমোদনের অনিয়ম, হাসপাতালগুলোতে সরঞ্জামের ত্রুটি—এসব অবহেলার ফলেই মারা যাচ্ছে সাধারণ মানুষ। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে তত্ত্বাবধায়ক পর্যায়ের পরিকল্পনার ঘাটতি। স্থানীয় প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সংযোগ এবং সমন্বয় নেই। ফলে, যেকোনো দুর্ঘটনা মুহূর্তে প্রাণহানি ঘটাতে পারে।
দুর্ঘটনার পর সরকারের প্রতিক্রিয়া প্রায়শই সীমিত—সংবাদমাধ্যমে দুঃখ প্রকাশ, ক্ষতিপূরণের ঘোষণা, সংক্ষিপ্ত আলোচনা। কিন্তু সেই পরবর্তী পদক্ষেপ না থাকায় দুর্ঘটনা পুনরাবৃত্তি হয়। তাই প্রতিটি দুর্ঘটনার পেছনে শুধু ‘দুর্ভাগ্য’ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার কাঠামোগত ব্যর্থতাই দায়ী।
অবহেলার এই চক্র শুধু প্রাণহানির কারণ নয়, এটি সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়, অনিশ্চয়তা ও আস্থা হ্রাস ঘটাচ্ছে। নিরাপদে বাঁচার অধিকার এখন এক ভয়ংকর দুর্লভ অধিকার। যে শহরগুলো আমরা নিরাপদ মনে করি, সেখানে প্রতিটি পদক্ষেপেই ঝুঁকি লুকিয়ে থাকে। ফুটপাথ দিয়ে হাঁটতে গেলে প্রাণ ঝুঁকির মুখে, বাসে চড়ে স্কুলে বা কলেজে যাওয়াও এক রকমের ঝুঁকি।
বাংলাদেশের উন্নয়ন অবশ্যই শুধু অবকাঠামোগত নয়, মানবিক দিক থেকেও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, রেলপথ, সড়ক—All should prioritize the life and safety of citizens over mere structural or economic progress. কিন্তু এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনা মানে শুধু “দেখানোর জন্য” প্রকল্প, যেখানে সাধারণ মানুষের জীবন এবং নিরাপত্তা দ্বিতীয়।
সরকার, প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, প্রতিটি নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা এবং যানবাহন ব্যবস্থায় সেফটি স্ট্যান্ডার্ড নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি প্রকল্পে নিয়মিত তদারকি এবং ফিটনেস চেক নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, জনগণকে জানানো, সচেতন করা এবং দুর্ঘটনার তথ্য খোলাখুলি করা আবশ্যক।
একটি প্রাণহানি অনেক সময় পরিবার, সম্প্রদায় এবং সমাজকে স্থায়ীভাবে প্রভাবিত করে। আবুল কালামের দুই শিশু সন্তানের জীবন—এগুলো শুধু ব্যক্তিগত দুঃখ নয়, পুরো দেশের দায়িত্বের প্রশ্ন তোলে। রাষ্ট্র যদি এই ধরনের উদাসীনতা পুনরায় পুনরাবৃত্তি করতে থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের জীবন শুধুই ভোগান্তি এবং ঝুঁকির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে।
আমাদের দরকার কঠোর জবাবদিহি। প্রতিটি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তাদের দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করতে হবে। নীতি নির্ধারকরা যেন বুঝতে পারেন, সাধারণ মানুষের জীবন কোনো খাতার সংখ্যা নয়। এটি মূলধন, এটি অমূল্য। প্রতিটি মানুষের মৃত্যু রাষ্ট্রের ব্যর্থতার প্রতিফলন।
উন্নয়ন কেবল কাঠামো নয়; এটি মানবিক দিক থেকেও সমান জরুরি। আমরা চাই স্বচ্ছ প্রশাসন, কার্যকর তদারকি, নিরাপত্তা মানদণ্ডের বাস্তবায়ন। প্রতিটি প্রজেক্টে জনগণের জীবন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য—এগুলোই অগ্রাধিকার হতে হবে। যতক্ষণ না নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, ততক্ষণ উন্নয়ন কেবল দেখানোর জন্য থাকবে, মানুষ থাকবে ঝুঁকির মধ্যে।
পরিশেষে, রাষ্ট্র যদি এ উদাসীনতা ও অবহেলা বন্ধ না করে, আমরা প্রতিনিয়ত “পরবর্তী দুর্ঘটনার” অপেক্ষায় থাকব। আর কত লাশ চাই আমাদের হুঁশ ফেরাতে? আর কত পরিবার নিঃস্ব হতে হবে, তবেই কি জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে উঠবে? সাধারণ মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও অধিকার—এসব রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের মূলমন্ত্র হওয়া উচিত। আমরা চাই না শুধু কাঠামোগত উন্নয়ন, আমরা চাই মানবিক, নিরাপদ, এবং দায়িত্বশীল রাষ্ট্র।
এখন সময় এসেছে, রাষ্ট্র জাগুক। সাধারণ মানুষের জীবন, তাদের নিরাপত্তা ও অধিকার—এসব মূল্যবান, অমূল্য, এবং অনন্য। আর কোনো ক্ষুদ্রতম “দুর্ঘটনা” যেন মানুষের জীবন ও পরিবারকে নিঃস্ব করতে না পারে—এটাই আমাদের অদম্য দাবি।
আকাশজমিন / আরআর