ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
অঙ্গ পাচার চক্রের হাত থেকে ফিরল লোহাগাড়ার রায়হান ডিএমপির ৩ সহকারী পুলিশ কমিশনারকে নতুন পদে বদলি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তাপ: বিশ্ববাজারে তেলের দাম ছাড়াল ১০৭ ডলার হরমুজে নতুন নৌপথ: ওমানের আঞ্চলিক বৈঠক স্থগিত দেশে ফিরে ইতালিতে হামলার বিরুদ্ধে মুখ খুললেন অভিনেত্রী বাঁধন ব্রিকসে বিশ্বনেতাদের দেওয়া হলো নিরামিষ খাবার: বিজেপি-কংগ্রেস তুমুল বিতর্ক সারাদেশে ঘরে ঘরে জ্বর: ডেঙ্গু ও হামের সঙ্গে বাড়ছে টাইফয়েড ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ হলেই কি থামবে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান যুদ্ধ? ‘ট্রফি চোর’ অপবাদ মাথায় নিয়ে শান্ত মেজাজে মাঠ ছাড়লেন নাকভি ২৩ বছরের খরা কাটল না আমেরিকার, ইউএস ওপেনের ট্রফি জভেরেভের হাতে

২৭ বছরের সংবাদে গড়া এক দম্পতির জীবনের জাদুঘর


  • আপলোড সময় : শনিবার ০৮ নভেম্বর, ২০২৫ সময় : ৮:২৯ পিএম

চুয়াডাঙ্গা শহরের কোর্টপাড়ার একটি বাড়িতে ঢুকলেই টের পাওয়া যায়—এখানে বই বা কাগজের নয়, ইতিহাসের গন্ধ। নিচতলার একটি ঘর ভর্তি পুরোনো পত্রিকায়। পাশের ঘরে সাজানো রয়েছে বছরের পর বছর ধরে জমিয়ে রাখা ম্যাগাজিন, ক্রোড়পত্র, বিশেষ সংখ্যা। এই ঘরগুলোই যেন এক জীবন্ত সংবাদ আর্কাইভ। আর এই অনন্য সংগ্রহের নেপথ্যে আছেন এক দম্পতি—কামরুল আরেফিন ও সালমা খাতুন।

১৯৯৮ সালের ৪ নভেম্বর থেকে আজও প্রতিদিন একটি জাতীয় দৈনিক সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে চলেছেন তাঁরা। ২৭ বছর ধরে একদিনও বিরতি দেননি এই কাজ থেকে। ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের এই মিশেলে গড়ে উঠেছে তাঁদের পত্রিকা সংগ্রহশালা।

কামরুল আরেফিন বলেন, ‘এই পত্রিকাটি যখন প্রথম প্রকাশিত হয়, তখনই বুঝেছিলাম এটা ভিন্ন ধাঁচের হবে। সালমাই প্রথম বিষয়টি আমার নজরে আনে। আমরা সিদ্ধান্ত নিই—প্রতিদিনের সংখ্যা জমিয়ে রাখব।’

প্রথম সংখ্যা হাতে পেয়ে তাঁরা দারুণ আনন্দিত হন। সেই থেকেই শুরু তাঁদের সংগ্রহের যাত্রা। দিন যায়, বছর পেরোয়—তবে এই দম্পতির ভালোবাসা যেন সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়েছে।

এখন তাঁদের বাড়ির দুটি কক্ষ পুরোপুরি পত্রিকায় ভর্তি। কোথাও সুন্দরভাবে সাজানো মাসভিত্তিক বান্ডিল, কোথাও ক্রোড়পত্রের আলাদা র‍্যাক। প্রতিবেশীরা বলেন, ঘরে ঢুকলেই মনে হয় সময় যেন থেমে আছে কাগজের পাতায়।

তাঁদের এই সংগ্রহশালা শুধু নিজেদের জন্য নয়, আশপাশের মানুষদের জন্যও এক শিক্ষার জায়গা হয়ে উঠেছে। অনেক শিক্ষক, শিক্ষার্থী, এমনকি গবেষকরাও পুরোনো সংখ্যা দেখতে বা তথ্য খুঁজতে আসেন এখানে। কেউ ইতিহাস খোঁজেন, কেউ খোঁজেন প্রামাণ্য খবরের সূত্র। সালমা খাতুন বলেন, ‘যখন দেখি কেউ আমাদের পুরোনো পত্রিকা দেখে তথ্য নিচ্ছে, তখন মনে হয় এত বছরের পরিশ্রম সার্থক।’

দুজনেরই এখন দিনের শুরু হয় চা হাতে পত্রিকা খুলে। গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো পড়ে নেওয়ার পর অর্থনীতি, সাহিত্য কিংবা উপসম্পাদকীয় পড়েন তাঁরা। সালমার পছন্দ লেখালেখি ও মানবিক গল্প; আর কামরুল পছন্দ রাজনীতি ও ইতিহাসভিত্তিক খবর।

কামরুল আরেফিন স্মৃতি হাতড়ে বলেন, ‘একসময় পত্রিকায় প্রকাশিত কার্টুন বা ছোট লেখাগুলো নিয়ে আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা করতাম। আজও মাঝে মাঝে পুরোনো সংখ্যাগুলো বের করে পড়ি। তখনকার ঘটনা, নির্বাচন বা দুর্ঘটনার খবরগুলো দেখে মনে হয়—আমাদের জীবনের অনেক গল্প এই পাতাগুলোয় বন্দি হয়ে আছে।’

পেশাগত জীবনে কামরুল আরেফিন দীর্ঘদিন সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৬৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমে কাজ করেছেন তিনি। বর্তমানে তিনি চুয়াডাঙ্গা জেলা আইনজীবী সমিতির জ্যেষ্ঠ সদস্য। স্ত্রী সালমা খাতুন চুয়াডাঙ্গা সিনিয়র কামিল মাদ্রাসার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। দুই সন্তানের মধ্যে মেয়ে কানিজ ফাতেমা একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন, এখন গৃহবধূ। ছেলে তিতুমীর আহমেদ ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড কমিউনিকেশন প্রকৌশলী হিসেবে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।

অসংখ্য মানুষ যখন পুরোনো কাগজ বিক্রি করে ঘর ফাঁকা করেন, তখন এই দম্পতি বরং ঘর ছেড়ে দিয়েছেন তাঁদের স্মৃতির জন্য। অনেকে উপদেশ দেন—‘এত পুরোনো কাগজ রেখে কী হবে!’ কিন্তু কামরুল আরেফিনের জবাব একটাই, ‘এই কাগজগুলো শুধু খবর নয়, এগুলো আমাদের জীবনের ইতিহাস। আমরা এগুলো বিক্রি করব মানে আমাদের অতীত বিক্রি করা।’

সালমা খাতুন বলেন, ‘এই পত্রিকাগুলোর প্রতি এমন মায়া জন্মেছে যে, বিক্রি করার কথা ভাবতেই পারি না। যতদিন বেঁচে আছি, এগুলো আমাদের সঙ্গেই থাকবে।’

তাঁদের এই আর্কাইভ এখন চুয়াডাঙ্গার মানুষের কাছে এক মানবিক গল্প। দুই মানুষ, দুই হৃদয়ের মিলন, আর এক টুকরো সময়ের ইতিহাস ধরে রাখার অবিচল প্রয়াস—এই দম্পতি যেন প্রমাণ করেছেন, ভালোবাসা শুধু মানুষের প্রতি নয়, শব্দ, সংবাদ ও সময়ের প্রতিও হতে পারে।

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর