ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণা হবে আজ সোমবার। এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে কোনো সরকারপ্রধানের বিরুদ্ধে প্রথম রায়। মামলায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের ‘সুনির্দিষ্ট পাঁচটি’ অভিযোগে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করেন।
পাঁচটি অভিযোগে আসামিদের বিরুদ্ধে সুপিরিয়র কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি বা ঊর্ধ্বতনের নির্দেশনার দায়সহ হত্যা, হত্যা-চেষ্টা, ব্যাপক মাত্রায় পদ্ধতিগত হত্যা, প্ররোচনা, উসকানি, সহায়তা, সম্পৃক্ততা, ষড়যন্ত্রসহ অন্যান্য অমানবিক আচরণের অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অপরাধ সংঘটিত হয় ১৪ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে।
প্রথম অভিযোগ:
চীন থেকে ফিরে ১৪ জুলাই গণভবনে সংবাদ সম্মেলন করেন শেখ হাসিনা। ওই সময় আন্দোলনরত ছাত্রদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’, ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ বলে রাষ্ট্র ও সহযোগী বাহিনীকে উসকানি দেন। আসাদুজ্জামান খান কামাল ও চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন অধীনস্ত বাহিনীকে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার জন্য ‘সুপিরিয়র কমান্ডার’ হিসেবে নির্দেশ দেন। এই নির্দেশে অধিনস্ত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও সহযোগী বাহিনী ব্যাপকভাবে পদ্ধতিগত হত্যা, হত্যা-চেষ্টা, নির্যাতন ও অন্যান্য অমানবিক আচরণ চালায়।
দ্বিতীয় অভিযোগ:
ছাত্র-জনতার ওপর হেলিকপ্টার, ড্রোন ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের হত্যা ও নির্মূলের নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশের মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন তাদের অধীনস্ত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের দিয়ে এই নির্দেশ কার্যকর করেন।
তৃতীয় অভিযোগ:
উসকানিমূলক বক্তব্য ও মারণাস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতাকে হত্যার নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা। তৎকালীন সরকারের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্ররোচনা, সহায়তা ও সম্পৃক্ততায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও সশস্ত্র আওয়ামী সন্ত্রাসীরা নিরীহ ছাত্রদের ওপর আক্রমণ চালায়। ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদকে লক্ষ্য করে একাধিক গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। পরে চাপ প্রয়োগে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন চারবার পরিবর্তন করা হয়।
চতুর্থ অভিযোগ:
‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির সময় রাজধানীর চানখাঁরপুলে নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর তৎকালীন সরকারের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী গুলি চালায়। এতে ছয়জন আন্দোলনকারী নিহত হয়। এই হত্যার মাধ্যমে আসামিরা হত্যার নির্দেশ, প্ররোচনা, উসকানি, সহায়তা, সম্পৃক্ততা ও ষড়যন্ত্রমূলক মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন।
পঞ্চম অভিযোগ:
ঢাকার আশুলিয়ায় ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর গুলি চালিয়ে ছয়জনকে হত্যা করা হয়। পরে তাদের লাশ পুড়িয়ে দেওয়া হয়। শেখ হাসিনা ও অন্যান্য আসামির জ্ঞাতসারে এই হত্যার মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে।
মামলায় তিন আসামির বিরুদ্ধে পাঁচটি মানবতাবিরোধী অপরাধের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগপত্র মোট ৮,৭৪৭ পৃষ্ঠার, যার মধ্যে তথ্যসূত্র ২,০১৮ পৃষ্ঠা, জব্দ তালিকা ও দালিলিক প্রমাণ ৪,০০৫ পৃষ্ঠা এবং শহীদদের তালিকা ২,৭২৪ পৃষ্ঠা। মোট ৮৪ জন সাক্ষী করা হয়েছে।
রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করা হয় ১৩ নভেম্বর। ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের প্যানেল রায় ঘোষণা করবেন। ট্রাইব্যুনালের অন্যান্য সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
প্রসিকিউশন ও রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীর যুক্তিকণ্ডনে আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা চাওয়া হয়েছে। রাজসাক্ষী হওয়ায় চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের রায় ট্রাইব্যুনালের বিবেচনার ওপর নির্ভর করছে। রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী বিশ্বাস করেন, শেখ হাসিনা ও কামাল খালাস পাবেন।
আকাশজমিন / আরআর