রায় ঘোষণার সময় আদালতের এজলাস কক্ষ আইনজীবী, রিট আবেদনকারী ও গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতে কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। রায়ে বলা হয়েছে— সংবিধানে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরলেও, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে। পরবর্তী অর্থাৎ চতুর্দশ জাতীয় নির্বাচন থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা কার্যকর হবে। প্রধান বিচারপতিসহ সাত বিচারপতি সর্বসম্মত মতেই এই রায় দেন।
নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের আপিল শুনানি শেষ হয় গত ১১ নভেম্বর। এরপর ২০ নভেম্বর রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য করা হয়। এর আগে টানা ১০ দিন— ২২, ২৩, ২৮, ২৯ অক্টোবর এবং ২, ৪, ৫, ৬ ও ১১ নভেম্বর শুনানি হয়।
রিটকারীদের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া। বিএনপির পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জয়নুল আবেদীন ও ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মোহামদ শিশির মনির। ইন্টারভেনর হিসেবে অংশ নেন ব্যারিস্টার এহসান আবদুল্লাহ সিদ্দিকী, ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল, অ্যাডভোকেট মহসীন রশিদ ও ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান এবং অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার অনীক আর হক।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার ইতিহাসে ফিরে তাকালে দেখা যায়— ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদে ত্রয়োদশ সংশোধনী পাসের পর এটি প্রথম অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু ১৯৯৮ সালে অ্যাডভোকেট এম সলিম উল্লাহসহ তিন আইনজীবী এই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করলে ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট হাইকোর্ট তা খারিজ করে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বৈধ ঘোষণা করে। পরে ২০০৫ সালে আপিল করা হলে ২০১১ সালের ১০ মে আপিল বিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায় দেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পাস হয় পঞ্চদশ সংশোধনী, যেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপ করা হয়। একই বছরের ৩ জুলাই গেজেট প্রকাশিত হয়।
পরে সরকার পরিবর্তনের পর গত বছরের ৫ আগস্ট রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে আবেদন করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ বিশিষ্ট ব্যক্তি— তোফায়েল আহমেদ, এম হাফিজউদ্দিন খান, জোবাইরুল হক ভূঁইয়া এবং জাহরা রহমান। একই বছরের ১৬ অক্টোবর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন।
এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার গত বছরের ২৩ অক্টোবর পৃথক আবেদন করেন। নওগাঁর রানীনগরের বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোফাজ্জল হোসেনও আরও একটি আবেদন দাখিল করেন।
সব আবেদন একসঙ্গে শুনানি নিয়ে আজকের রায়ের মাধ্যমে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল হলো— যা দেশের রাজনীতি, নির্বাচনব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক কাঠামোয় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।