ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের বিকল্প নেই: ড. আবদুল মঈন খান স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা নেই: মীর শাহে আলম দুপুরের মধ্যেই বিদ্যুৎ পাচ্ছে বাংলাদেশ: কমবে লোডশেডিং এমপিও শিক্ষকদের নির্বাচন ভাগ্য নির্ধারণ করবে ইসি: মীর শাহে আলম সরকারি কেনাকাটায় পুকুরচুরি ঠেকাতে আসছে অভিন্ন একক দরতালিকা সাগর-রুনি হত্যার বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ তারুণ্য না অভিজ্ঞতা: ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব চয়নে জটিল হিসাব-নিকাশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জের রিট খারিজ হাইকোর্টে ইন্দোনেশিয়ায় ২৪০ যাত্রী নিয়ে জাহাজ নিখোঁজ ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত, আটক ২

৭০ একর সরকারি জমি দখল

সোনাদিয়ায় ঝাউবন কেটে কটেজ নির্মাণ!


৭০ একর সরকারি জমি দখল

  • আপলোড সময় : রবিবার ৩০ নভেম্বর, ২০২৫ সময় : ৩:৫৪ পিএম

কক্সবাজার প্রতিনিধি 

কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার সোনাদিয়া দ্বীপে বনভূমি ও সরকারি জমি দখল করে অবৈধ কটেজ ও রিসোর্ট নির্মাণের ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। সম্প্রতি জানা গেছে, দ্বীপে অন্তত ১৫টি কটেজ ও রিসোর্ট নির্মাণ করা হয়েছে এবং আরও কয়েকটির নির্মাণকাজ চলছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, ঝাউগাছ কেটে এবং বন বিভাগের জমি দখল করে রাতের অপ্রাকৃতিক আলো ও গানের আওয়াজের মাধ্যমে মা কচ্ছপদের ডিম পাড়ার মৌসুম ব্যাহত করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত কচ্ছপের ডিম পাড়ার মৌসুম হলেও চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত কোনো কচ্ছপ সৈকতে ডিম দিতে আসেনি। সম্প্রতি, নির্জন দ্বীপে পর্যটকের আনাগোনা, সৈকতে রাতে আলো-সজ্জা, উচ্চ শব্দে বাদ্যযন্ত্র বাজানো, ঝাউগাছ উজাড় করে কটেজ ও রিসোর্ট নির্মাণ এবং রাতযাপন পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করেছে।

নেচার কনজারভেশন ম্যানেজমেন্ট (নেকম) কক্সবাজারের ব্যবস্থাপক আবদুল কাইয়ুম বলেন, সোনাদিয়া দ্বীপে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা না করা হলে দ্বীপটি সংকটাপন্ন হয়ে যাবে। ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস) তথ্যমতে, দ্বীপের অন্তত ৭০ একর সরকারি জমি অবৈধভাবে দখল করা হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কয়েকজন নেতা এই দখল-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত আছেন।

সোনাদিয়া দ্বীপের আয়তন প্রায় ৯ বর্গকিলোমিটার। দ্বীপের পূর্ব পাশে মগচরে সৈকতের তীরে প্রায় পাঁচ একর ঝাউবন উজাড় করে স্যান্ডি বিচ রিসোর্ট নির্মাণ করা হয়েছে। বাঁশ ও কাঠ দিয়ে পাঁচটি কটেজ গড়ে তোলা হয়েছে। রিসোর্টে বিদ্যুতের বাল্ব দিয়ে সাজানো হয়েছে। মালিক মোহাম্মদ ফারুক জানান, চারজন ব্যবসায়ী মিলিত হয়ে রিসোর্টটি তৈরি করেছেন। আগামী এক মাসে আরও দুটি কটেজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে রিসোর্টে ১০০ জন থাকার ব্যবস্থা আছে এবং ডিসেম্বরের জন্য ১৭ দিনের বুকিং সম্পন্ন।

দ্বীপের পূর্বপাড়ায় আরও একটি রিসোর্ট ক্যাম্প ফায়ার সোনাদিয়া নির্মাণ করেছেন শামীম ও রাকিব। পশ্চিমপাড়ার ঘাট থেকে ওঠার পর কটেজ স্যান্ডি হিল বিচ সোনাদিয়া নির্মাণ করেছেন পারভেজ। এর দক্ষিণ পাশে সৈকতের তীরে নির্মিত কটেজ মেরিনা ডি সোনাদিয়া করিম মিয়া ও শফিক মিয়ার উদ্যোগে নির্মিত।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সোনাদিয়া দ্বীপ দেশের ১৩টি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) এর একটি। এ ধরনের এলাকায় পানি, মাটি, বায়ু বা জীবজন্তুর ক্ষতি করলে শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড বা তিন লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে। পরিবেশ আদালত আইনের অধীনে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে।

দ্বীপে অবৈধ নির্মাণ রোধের দায়িত্ব জেলা, উপজেলা প্রশাসন ও বন বিভাগের। বন বিভাগের একটি বিট অফিস থাকলেও সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে নির্মাণকাজ চলছে। মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. হেদায়েত উল্যাহ্ জানিয়েছেন, অবৈধ স্থাপনার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে এবং পুনরায় অভিযান করা হবে।

২০১৭ সালে ইকো-ট্যুরিজম পার্ক তৈরির জন্য বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) দ্বীপের ৯,৪৬৭ একর জমি বরাদ্দ দিয়েছিল। ভারতের মাহিন্দ্র ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান মহাপরিকল্পনা তৈরি করেছিল। তবে বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের অনুরোধে বেজাকে দেওয়া বন্দোবস্ত বাতিল করা হয়েছে।

এছাড়া, সোনাদিয়া দ্বীপে পর্যটক যাতায়াত বেড়েছে সেন্টমার্টিন বন্ধ থাকায়। কটেজ ও রিসোর্টে রাতযাপনসহ বারবিকিউ পার্টি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে দ্বীপে প্রতিমাসে প্রায় এক হাজার পর্যটক আসছেন, যাদের অর্ধেকের বেশি রাতযাপন করছেন।

দ্বীপের জীববৈচিত্র্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্যারাদ্বীপ নামেও পরিচিত এই দ্বীপে ম্যানগ্রোভ বন, লাল কাঁকড়া, বিপন্ন সামুদ্রিক কাছিমসহ ৫৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, ১৫২ প্রজাতির শামুক, ২১ প্রজাতির কাঁকড়া, ২০৭ প্রজাতির মাছ, ১২ প্রজাতির উভচর, ১৯ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ২০৬ প্রজাতির পাখি আছে।

নেকম ও ইয়েসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা, প্লাস্টিকের বোতল ও কটেজ-রিসোর্টের বর্জ্য পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। ঝাউগাছ উজাড় করে অবকাঠামো নির্মাণের কারণে দ্বীপটি সেন্টমার্টিনের মতো সংকটাপন্ন হয়ে যাচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের পরিচালক মো. জমির উদ্দিন বলেছেন, সোনাদিয়া দ্বীপে কোনো স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়নি। অবৈধ কটেজ ও রিসোর্টের খবর পেলে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সোনাদিয়া দ্বীপে অবৈধ নির্মাণ বন্ধে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, বন বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তর যৌথভাবে কাজ করছে। স্থানীয়রা মনে করছেন, দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ না নিলে দ্বীপের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হবে।

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর