খুলনা প্রতিনিধি
অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ গণহত্যার স্মৃতিবিজড়িত স্থান খুলনার চুকনগর বধ্যভূমি। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও এখানে নির্মিত হয়নি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ। সারাবছর ঝোপঝাড়ে ঢাকা পড়ে থাকে এই বধ্যভূমি; নেই কোনো সাইনবোর্ড বা স্মৃতিফলক। স্থানীয়দের ভাষ্য, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস ও বিজয় দিবস ঘনিয়ে এলে কেবল মাত্রিকভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়, বাকিটা সময় কেউ নজর রাখে না।
খুলনা শহর থেকে পশ্চিমে ৩২ কিলোমিটার দূরে, ভারত সীমান্তবর্তী ভদ্রা নদীর তীরে অবস্থিত চুকনগর। ডুমুরিয়া উপজেলার আটলিয়া ইউনিয়নের এই জায়গায় মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সংঘটিত করে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা। সেই দিনে ১০ হাজারের বেশি নারী-পুরুষ ও শিশু নির্মমভাবে নিহত হয়েছিলেন। পাশের ঘ্যাংরাইল নদীর পানি রক্তে লাল হয়ে উঠেছিল। এক এলাকায় একদিনে এত প্রাণহানি আর কোনোদিন ঘটেনি। ২০০৬ সালে গণপূর্ত বিভাগ সাত লাখ টাকা ব্যয়ে ‘চুকনগর গণহত্যা স্মৃতিস্তম্ভ’ নির্মাণ করলেও গত ১৯ বছরেও এর কাজ সম্পূর্ণ হয়নি। স্থায়ীভাবে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কেউ নিযুক্ত নেই। সীমানাপ্রাচীরের বড় একটি অংশ ভেঙে পড়েছে, ফাটল ধরেছে স্মৃতিস্তম্ভের বিভিন্ন অংশে। এত কিছুর পরও সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
চুকনগরের মালতী গ্রামের মো. ইসমাইল শেখ (৬৫) বলেন, পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা যে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। চারদিকে লাশের স্তূপ পড়ে ছিল। ঘ্যাংরাইল নদী রক্তে লাল হয়ে উঠেছিল। এমন অসংখ্য মানুষের ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা এসেছে। অথচ সেই হত্যাযজ্ঞের সাক্ষী এই বধ্যভূমি সারা বছর অবহেলায় পড়ে থাকে। প্রশাসনের উচিত এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ কমপ্লেক্স তৈরি করা।
স্মৃতিস্তম্ভটি ঘুরে দেখা যায়, এতে নেই নামফলক কিংবা পটভূমি। বেদির পেছনে বড় ফাটল; এক পাশের ইট খসে পড়েছে। সীমানাপ্রাচীরের দক্ষিণ-পশ্চিম দিক পুরোপুরি ভেঙে গেছে। এক কোণায় জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা দেখে বোঝা যায় দীর্ঘদিন কোনো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা হয়নি।
স্থানীয় সূত্র জানায়, চুকনগর গণহত্যার স্মরণে প্রতিবছর ২০ মে, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস, বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবসে এখানে ফুল দেওয়া হয়। কিন্তু বছরের বাকিটা সময় স্মৃতিস্তম্ভ থাকে অবহেলায়।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানি বাহিনী বেছে নেয় নির্মম গণহত্যার পথ। ২৫ মার্চের অপারেশন সার্চলাইট দিয়ে শুরু হয় তাদের বর্বরতা। হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, লুণ্ঠনের হাত থেকে বাঁচতে মানুষ দলে দলে সীমান্ত এলাকায় আশ্রয় নিতে থাকে। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে চুকনগর হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ একটি ট্রানজিট এলাকা। তিন দিক নদীবেষ্টিত হওয়ায় এখান থেকে কয়েক কিলোমিটার নদীপথ পার হলেই পৌঁছানো যেত ভারতের সীমানায়। যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, মোরেলগঞ্জ, কচুয়া, মোংলা, দাকোপ, বটিয়াঘাটা, চালনা, ফরিদপুর ও বরিশালসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ এখানে জড়ো হয়েছিলেন নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে।
১৯৭১ সালের ১৮ ও ১৯ মে এই অঞ্চলে নদীপথে হাজারো মানুষ আসতে থাকে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ভারতে আশ্রয় নেওয়া। কিন্তু স্থানীয় রাজাকার ও আলবদর সদস্যরা বিষয়টি পাকিস্তানি বাহিনীকে জানায়। তারপর আসে ইতিহাসের এক কালো দিন—২০ মে।
সেদিন সকাল থেকে মানুষ প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন নদীপথে ভারত যাওয়ার জন্য। বেলা ১১টার দিকে সাতক্ষীরা-খুলনা সড়ক ধরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ১৪-১৫ জন সদস্য ট্রাক ও জিপে করে এসে চুকনগর বাজারের পাশের ঝাউতলায় অবস্থান নেয়। সামনে বিস্তীর্ণ পাতখোলা মাঠে তখন হাজার হাজার মানুষ। আচমকা শুরু হয় বেপরোয়া গুলিবর্ষণ। কয়েক মুহূর্তেই রক্তে লাল হয়ে যায় মাঠ। আরেকটি ট্রাক যায় চুকনগর বাজারে এবং সেখানেও চালানো হয় নির্বিচার ব্রাশফায়ার। মন্দির এলাকা, ঘাট, নদীর পাশ—সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে মৃতদেহ। ভদ্রা নদীতে আশ্রয় নেওয়া মানুষও রেহাই পায়নি। বিকাল ৩টা পর্যন্ত চলে এই হত্যাযজ্ঞ।
চুকনগরের বাসিন্দা ফজলুর রহমান মোড়ল, যার বয়স তখন ছিল মাত্র ১৪-১৫ বছর, বর্ণনা দেন—কীভাবে তিনি পানিতে ঝাঁপিয়ে প্রাণে বেঁচে যান। তার ভাষ্যমতে, এদিন ১০-১২ হাজারের মতো মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। জোয়ারের পানিতে লাশ ভেসে যেত, আবার ভাটায় এসে জমত। স্থানীয়রা কয়েক দিন ধরে নদীর পানি থেকে লাশ সরিয়ে দূরে সরিয়ে রাখতেন, যেন পুনরায় ভেসে না আসে।
দীর্ঘদিন এই গণহত্যার ঘটনা ছিল উপেক্ষিত। ১৯৯৩ সালে গঠিত হয় ‘চুকনগর গণহত্যা ৭১ স্মৃতি রক্ষা পরিষদ’। পরে ২০০৪ সালে সরকার ৭৮ শতক জমি অধিগ্রহণ করে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। ২০০৬ সালে নির্মিত হয় বর্তমান স্মৃতিস্তম্ভ, যা এখনও অপূর্ণ।
২০২০ সালের ১৮ অক্টোবর মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ নির্মাণ ও বধ্যভূমিকে পূর্ণাঙ্গ কমপ্লেক্সে রূপ দেওয়ার প্রস্তাব স্থানীয় সরকার বিভাগে পাঠান গণপূর্ত বিভাগ-২-এর তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী। কয়েক দফা বরাদ্দ চাওয়া হলেও মেলেনি। গত সেপ্টেম্বর মাসে ডুমুরিয়া উপজেলা উন্নয়ন তহবিল থেকে পটভূমি ও নামফলকের জন্য মাত্র পাঁচ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এখনও কাজ শুরু হয়নি।
চুকনগর বধ্যভূমির দায়িত্ব পালনকারী মো. ফজলুর রহমান মোড়ল জানান, ২০২০ সালে পরিদর্শনকালে তৎকালীন সচিব প্রকল্প করার কথা বললেও পরে আর কোনও অগ্রগতি হয়নি। তিনি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী বধ্যভূমি রক্ষণাবেক্ষণ করেন। তবে ছাউনি না থাকায় বৃষ্টিতে স্মৃতিস্তম্ভের নিচের অংশ স্যাঁতসেঁতে হয়ে পড়ে। কোথাও নেই ওয়াশরুম, ফলে দর্শনার্থীরা ভোগান্তিতে পড়েন।
চুকনগর গণহত্যা ৭১ স্মৃতি রক্ষা পরিষদের সভাপতি শফিকুল ইসলাম জানান, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও বধ্যভূমিতে স্মৃতিসৌধ বা কমপ্লেক্স নির্মাণ হয়নি। তার দুঃখ—স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্রের বিশাল গ্রন্থমালায় কোথাও চুকনগরের গণহত্যার বর্ণনা নেই। তবুও শহীদদের পরিবার ও স্থানীয় মানুষ আশা করেন, একদিন চুকনগরের গণহত্যা সরকারি স্বীকৃতি পাবে।
এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী মুহাম্মদ দারুল হুদা জানান, পাঁচ লাখ টাকার বরাদ্দে এত কাজ করা সম্ভব নয়। আরও সরকারি বরাদ্দ প্রয়োজন। কাজ শুরু করে অতিরিক্ত বরাদ্দ পাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবিতা সরকার জানান, তিনি নতুন যোগদান করেছেন এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
আকাশজমিন / আরআর