সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি / : 73
রেজাউল করিম ঝন্টু, সিরাজগঞ্জ
আজ ১৩ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জের তাড়াশ হানাদারমুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে তাড়াশ উপজেলা ও আশপাশের এলাকা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধে তাড়াশ ও চলনবিল অঞ্চলের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের স্মরণে প্রতিবছর দিনটি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়ে থাকে।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ১১ নভেম্বর তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ এলাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় যুদ্ধকালীন গেরিলা সংগঠন পলাশডাঙ্গা যুবশিবিরের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মুখোমুখি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ওই যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা অভিযানে পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের সহযোগী রাজাকার বাহিনীর প্রায় ১৩০ জন সদস্য নিহত হয়। এ সময় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে আসে। একই সঙ্গে বেলুচ রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন সেলিমসহ ৯ জন পাকিস্তানি সেনা সদস্যকে জীবিত আটক করা হয়।
চলনবিল অঞ্চলের বীর মুক্তিযোদ্ধারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এই প্রতিরোধ যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন যুদ্ধকালীন গেরিলা সংগঠন পলাশডাঙ্গা যুবশিবিরের সর্বাধিনায়ক প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফ মির্জা এবং সহ-সর্বাধিনায়ক প্রয়াত গাজী এম এম আমজাদ হোসেন মিলন। তাদের নেতৃত্বে পরিচালিত গেরিলা যুদ্ধ তাড়াশসহ আশপাশের অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর মনোবল ভেঙে দেয়।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১১ নভেম্বর চলনবিলের প্রাণকেন্দ্র অলিয়ে কামেল হজরত শাহ শরিফ জিন্দানী (রহ.)-এর মাজার এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধকে উত্তরবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ হিসেবে ইতিহাসে বিবেচনা করা হয়।
১১ নভেম্বরের যুদ্ধে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালের ১৩ নভেম্বর তাড়াশ উপজেলার আমবাড়িয়া গ্রামে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ ও অগ্নিসংযোগ চালায়। ওই ঘটনায় দৈনিক আজাদের সাংবাদিক ও শিক্ষক ইয়ার মোহাম্মদসহ ১৩ জন নিরীহ গ্রামবাসী শহীদ হন। এই বর্বর হত্যাকাণ্ড তাড়াশ অঞ্চলের মানুষকে আরও ক্ষুব্ধ ও প্রতিরোধে দৃঢ় করে তোলে।
শেষ পর্যন্ত যুদ্ধকালীন গেরিলা সংগঠন পলাশডাঙ্গা যুবশিবিরের মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ অবদান ও সাধারণ জনগণের সহযোগিতায় ১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর তাড়াশ এলাকা সম্পূর্ণভাবে শত্রুমুক্ত ঘোষণা করা হয়। এ দিন তাড়াশের মানুষ উল্লাসে মেতে ওঠে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে বিজয় উদযাপন করে।
তাড়াশ হানাদারমুক্ত দিবস তাড়াশবাসীর জন্য শুধু একটি ঐতিহাসিক দিন নয়, এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আত্মত্যাগ ও স্বাধীনতার অনন্য স্মারক হিসেবেও বিবেচিত।