সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি / : 169
রেজাউল করিম ঝন্টু
শীতের আগমন হলে গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে দেখা মেলে এক বিশেষ দৃশ্য। পৌষ মাস মানেই পিঠা-পুলি, এবং এই সময়েই নবান্নের পরিপূর্ণতা আসে হেমন্তের শেষে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁর কবিতায় এই ঋতুর যে সৌন্দর্য তুলে ধরেছেন, তা বাংলার সংস্কৃতিতে গভীরভাবে প্রোথিত। "পৌষ তাদের ডাক দিয়েছে, আয় রে চলে, আয় আয় আয়…"—এই কথা যেমন মাটির সাথে জড়িয়ে থাকা প্রকৃতির আহ্বান, তেমনি শীতকালীন পিঠা-পুলি সেই আহ্বানকে বাস্তবে রূপ দেয়।
অগ্রহায়ণ ও পৌষ মাসে মাঠ থেকে সোনালী ধান ঘরে ওঠার পর গ্রামীণ জীবনে শুরু হয় উৎসবের আমেজ, যার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে পিঠা-পুলি। শীতের হিমেল হাওয়ায় পিঠা খাওয়ার ধুম গ্রামবাংলার এক চিরায়ত ঐতিহ্য। অতীতে পিঠা তৈরির আয়োজন সীমাবদ্ধ ছিল গৃহস্থের অন্দরমহলে; দাদি-নানি, মা-খালারা মমতায় তৈরি করতেন নানা ধরনের রসালো পিঠা। আজকের দিনে সেই ঐতিহ্য অর্থনীতির মূল স্রোতে মিশে গেছে।
নতুন ধানের চালের গুঁড়া, দুধ ও খেজুরের পাটালি গুড় মিলে তৈরি হয় নানা স্বাদের পিঠা। নারকেলের কোড়া পিঠার অপরিহার্য উপাদান। বাঙালির হৃদয়ের গভীরে পিঠার অবস্থান অসীম; এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার যিনি পিঠা পছন্দ না করেন। শীতকাল এলেই আত্মীয়-স্বজনের মাঝে ঘর বাড়িতে যায় পিঠার উষ্ণ দাওয়াত।
পিঠা শুধু নিত্য খাবার না হলেও, শীতকালে এর কদর বাড়ে বহুগুণ। বর্তমানে শুধু বাড়িতে নয়, গ্রাম বাংলার হাটবাজারে সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত পিঠা বিক্রি হয় সারিবদ্ধভাবে। পিঠা বিক্রি করে হাজার হাজার মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছেন। শীতকে উপেক্ষা করে এই মানুষগুলো গ্রামবাংলার ঐতিহ্য পিঠাকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন।
পিঠার চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এর উপকরণগুলোর দামও বাড়ছে। চালের গুঁড়া, খেজুরের গুড় ও নারকেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী। বর্তমানে বাজারদর অনুযায়ী খেজুরের গুড় প্রতি কেজি ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা, দুধ ৮০ থেকে ১০০ টাকা, আতব চাল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা এবং নারকেল প্রতি পিস ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
পিঠা বিক্রেতা হালিমা খাতুন জানান, শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন বাসা থেকে পিঠা কেনার ভিড় বেড়ে গেছে। গত কয়েকদিনে চাহিদা বৃদ্ধির কারণে প্রয়োজন মতো পিঠা সরবরাহ করতে হিমশিম খাচ্ছেন। তিনি বলেন, প্রতি পিস পিঠা আকার ভেদে ১০ থেকে ১৫ টাকা করে বিক্রি করি। চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে আল্লাহর রহমতে আয়ের পরিমাণও বেড়েছে।
তাড়াশ উপজেলার চৌড়া গ্রামের আকাশ জানান, শ্বশুরবাড়ির দাওয়াত, তাই শীতে কষ্ট হলেও সব কাজকর্ম ফেলে পিঠা খেতে এসেছি। গ্রামীণ ঐতিহ্য, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং সামাজিক সম্পর্কের এই মেলবন্ধন সমগ্র গ্রামবাংলায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ঐতিহ্যবাহী এই পিঠা উৎসব একদিকে যেমন সংস্কৃতির ধারক, অন্যদিকে তেমনি হাজারো মানুষের জীবিকার উৎস। পিঠার মাধ্যমে গ্রামীণ সমাজের বন্ধন সুদৃঢ় হয়, সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয় এবং অর্থনৈতিক দিক থেকেও এটি একটি বড় অবদান রাখে।
শীতকালের ঠাণ্ডা বাতাস, সোনালী ধানের খেতে সূর্যের মৃদু আলোর ছোঁয়া, আর সেই সাথে ঘরে ঘরে তৈরি হওয়া পিঠার গন্ধ—এসব মিলিয়ে গড়ে ওঠে এক চিরায়ত শীতকালীন গ্রামবাংলার মনোরম দৃশ্য। বাংলার এই ঐতিহ্য রক্ষা এবং সঞ্চারে তরুণ প্রজন্মেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আধুনিকতায় হারিয়ে যাওয়া এই সাংস্কৃতিক সম্পদকে বাঁচিয়ে রাখতে পিঠা উৎসব একটি শক্ত ভিত হিসেবে কাজ করছে।
নবান্নের এই উষ্ণ আহ্বান শোনায়, প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে আমরা যেন নিজের শেকড়কে ধরে রাখি, আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকি। পিঠা-পুলি শুধু খাবার নয়, এটি গ্রামীণ বাংলার জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ, যা শীতের সঙ্গে মিশে এক নতুন মাত্রায় পৌঁছে যায়।
আকাশজমিন / আরআর