অনলাইন রিপোর্টার
বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। তিনি মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। ৮০ বছর বয়সী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। ফুসফুস ও হৃদ্যন্ত্রের সংক্রমণ, নিউমোনিয়া, কিডনি, লিভার, আর্থ্রাইটিস ও ডায়াবেটিসসহ নানা পুরোনো অসুখে তিনি আক্রান্ত ছিলেন। গত ২৩ নভেম্বর রাতে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল এবং দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চলছিল।
আজ সকালে তার মৃত্যু সংবাদে রাজধানীর বসুন্ধরার এভারকেয়ার হাসপাতাল এলাকায় হাজারো মানুষ ভিড় জমান। নেতা-কর্মী, সমর্থক এবং সাধারণ মানুষ—সবাই মিলে শোক, নীরবতা ও আবেগের এক প্রাঙ্গণ তৈরি করেন। হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের চোখে-মুখে গভীর শোকের ছায়া দেখা যায়। কেউ চুপচাপ দাঁড়িয়ে, কেউ চোখ মুছছেন, কেউ দুই হাত তুলে দোয়া করছেন। ভিড়ের মধ্যে কান্না, দীর্ঘশ্বাস ও স্মৃতিচারণার শব্দ মিলেমিশে এক ভারী আবহ তৈরি করেছে।
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল স্বামী জিয়াউর রহমানকে হারানোর বেদনা থেকে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর সংকটে পড়ে বিএনপি। ঠিক সেই সময় গৃহবধূ খালেদা জিয়া দলটিতে যোগ দেন। ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি বিএনপিতে যোগ দেন, ১৯৮৩ সালের মার্চে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হন এবং ১ এপ্রিল দলের বর্ধিত সভায় প্রথমবারের মতো বক্তৃতা দেন। বিচারপতি সাত্তার অসুস্থ হওয়ার কারণে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৮৪ সালের ১০ মে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কাউন্সিলের মাধ্যমে চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন এবং মৃত্যুর দিন পর্যন্ত দায়িত্বে থাকেন।
চেয়ারপারসনের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় খালেদা জিয়া তিনবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। প্রথমবার ১৯৯১ সালে, দ্বিতীয়বার ১৯৯৬ সালে এবং তৃতীয়বার ২০০১ সালে। দ্বিতীয় দফার প্রধানমন্ত্রী পদে তিনি এক মাস দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া, বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রচার বিভাগ জানায়, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দল ১৯৮৩ সালে সাত-দলীয় জোট গঠন করে জেনারেল এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম চালায়। দীর্ঘ আন্দোলনের মধ্যে খালেদা জিয়া কখনও আপস করেননি। নিষেধাজ্ঞামূলক আইন ও কারাবন্দির মধ্যেও তিনি রাজনৈতিক নেতৃত্ব বজায় রাখেন।
৪১ বছরের রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়া বহুবার সংকটের মুখে পড়েছেন। ২০০৮ সালের পর আদালতের আদেশে তার স্বামীর সময়ে পাওয়া বাড়ি হারানো, ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর শোকসহ নানা ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। ২০১৫ সালে তিন মাসের অবরোধ চলাকালে তার বিরুদ্ধে আগুন সন্ত্রাসের অভিযোগ ওঠে, যদিও বিএনপি নেতারা দাবি করেন, এটি ক্ষমতাসীনদের কৌশল।
জাতীয়তাবাদী ঘরানার বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, “বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে খালেদা জিয়ার অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। তিনিই দেশের জনপ্রিয়তম নেতা। কখনোই নির্বাচনে পরাজিত হননি।”
খালেদা জিয়া ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলার জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার আদি নিবাস ফেনী জেলার ফুলগাজী থানায়। ৫ ভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয় ছিলেন। প্রাথমিক শিক্ষা মিশনারি স্কুলে এবং পরে দিনাজপুর বালিকা হাইস্কুল থেকে ১৯৬০ সালে এসএসসি পাশ করেন। একই বছর তৎকালীন ক্যাপ্টেন (পরবর্তী রাষ্ট্রপতি) জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিয়ে হয়। তাদের দুই সন্তান—তারেক রহমান ও প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকো।
এরশাদের শাসনামলে খালেদা জিয়া জেলে যান, বিশেষ করে ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে। ক্যান্টনমেন্টের মইনুল রোডের বাসভবন থেকে গ্রেপ্তারের পর সিএমএম আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। জামিন নামঞ্জুর হলে সাব জেলে রাখা হয়। ৩৭২ দিন কারাবন্দি থাকার পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মুক্তি পান। কারাবন্দি অবস্থায় তার মা মারা যান, যার লাশ হেলিকপ্টারে ঢাকায় আনা হয়।
২০১৮ সালে দুদকের মামলায় কারাগারে যেতে হয়। দুই বছরের কারাবন্দি থাকার পর ২০২০ সালে পারিবারিক আবেদনের ভিত্তিতে ছয় মাসের শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান। ২০২৫ সালের ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের ক্ষমতাবলে দণ্ডমুক্ত হন।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় গুণ হলো তিনি কখনো নির্বাচনে পরাজিত হননি। ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি সব আসনে জয়লাভ করেন। বিএনপির চেয়ারপারসন এবং দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার অবদান ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।