সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি / : 97
রেজাউল করিম ঝন্টু, সিরাজগঞ্জ
সিরাজগঞ্জের তাড়াশসহ চলনবিল অঞ্চলের মৌচাষিরা সরিষা ফুলের মধু সংগ্রহে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। এই অঞ্চলের হলুদ সরিষা ফুলের মাঠ এখন মৌমাছির গুঞ্জনে মুখরিত হয়ে উঠেছে। চলনবিল শুধু মাছ, ধান, সরিষা ও রসুনের জন্যই নয়, মধু উৎপাদনেও বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছে। চলতি রবি মৌসুমে চলনবিলের ৯টি উপজেলায় প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের সরিষা চাষ হয়েছে, যা মধু আহরণের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলনবিলের সরিষা ক্ষেতের মাঠগুলো এখন হলুদ ফুলের সমারোহে মোড়া, যেখানে ইউরোপিয়ান হাইব্রিড এপিস মেলিফেরা মৌমাছি ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে ফুলে বসে মধু সংগ্রহ করছে। মৌচাষিরা আশাবাদী, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এ অঞ্চল থেকে প্রায় ১ লক্ষ ২৫ হাজার ৭২৫ কেজি বা ৫১ মেট্রিক টনের বেশি মধু আহরণ সম্ভব। বর্তমান বাজার মূল্য অনুযায়ী প্রতি কেজি মধুর দাম ৪০০ টাকা ধরা হলে, এই মধুর মোট মূল্য দাঁড়ায় প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ টাকার বেশি।
প্রায় এক মাস আগে বগুড়া, যশোর, কুষ্টিয়া, খুলনা, সাতক্ষীরা, পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে তিন শতাধিক প্রশিক্ষিত মৌচাষি চলনবিলে অস্থায়ী আবাস গড়ে মৌ-বাক্স বসিয়েছেন। চলতি মৌসুমে সরিষার জমির আইলে মোট ৭ হাজার ৭১৫টি মৌবাক্স স্থাপন করা হয়েছে। মাগুড়া থেকে আসা মৌচাষি রফিকুল জানান, মধু সংগ্রহের জন্য তাঁরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান নেন। সরিষা ফুলের মৌচাষের জন্য সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া, লিচুর জন্য দিনাজপুর ও নাটোর, কুমড়ার জন্য ঠাকুরগাঁও, কালোজিরার জন্য শরীয়তপুর এবং তিল ফুলের জন্য নিজের এলাকায় অবস্থান করেন। মৌমাছিদের বছরজুড়ে ভালো রাখার জন্য চার থেকে পাঁচ মাস চিনি খাইয়ে সংরক্ষণ করতে হয়।
পরিবেশবিদরা জানান, মৌমাছি শুধুমাত্র মধু সংগ্রহ করে না, বরং ফসলের জন্য ক্ষতিকারক কীটপতঙ্গ মারাত্মকভাবে কমিয়ে ফসলের উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করে। এতে ফসলে কম কীটনাশক ব্যবহার হয় যা পরিবেশের জন্য উপকারী। এছাড়া বিভিন্ন কোম্পানির এজেন্টরা চলনবিল থেকে অপরিশোধিত মধু অগ্রিম কেনা শুরু করেছেন।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, মধু প্রাচীনকাল থেকে বহু রোগের প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মধু পরিপাক সহজ করে, বিভিন্ন জটিল রোগ নিরাময়ে সাহায্য করে এবং পুষ্টিগুণে ভরপুর। তাড়াশ উপজেলা কৃষি অফিসার শমিষ্ঠা সেন গুপ্তা জানান, চলতি মৌসুমে ১০,৩১০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। মৌমাছির পরাগায়ন সাহায্যে সরিষার ফলনও উন্নত হচ্ছে। প্রতি বছর চলনবিল এলাকায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মৌচাষিরা আসেন, যারা সংগৃহীত মধু পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন। সরিষার মধু শুধু দেশীয় চাহিদাই পূরণ করছে না, বরং এর বিদেশী বাজারও রয়েছে।
এই অঞ্চলের সরিষা ফুলের মৌচাষ ও মধু উৎপাদনে আগ্রহ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে সরিষার বাম্পার ফলনের পাশাপাশি মধুর উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। মৌচাষিরা আশা প্রকাশ করেছেন, চলতি মৌসুমে চলনবিল অঞ্চলের সরিষা ফুলের মধু দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও সফলতা অর্জন করবে।