পাবনা-১ ও ২ আসনের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় স্থানীয় ভোটার ও প্রার্থীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও পাবনার জেলা প্রশাসক গণ-বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানিয়েছেন, পাবনা-১ ও ২ আসনের নির্বাচন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত রাখা হবে।
গত শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) সকালে নির্বাচন কমিশন থেকে পাবনার এই দুটি আসনের নির্বাচন স্থগিত করার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। সেই খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পরই স্থানীয় ভোটার ও প্রার্থীদের মধ্যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়। দুপুরে নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ দপ্তর থেকে গণমাধ্যমে বার্তা পাঠিয়ে জানানো হয়, পাবনা-১ ও ২ আসনে নির্বাচন স্থগিতের খবর সঠিক নয় এবং প্রকাশিত সংবাদ বন্ধ রাখার অনুরোধ জানানো হয়।
এরপর শনিবার (১০ জানুয়ারি) আসন ২টির নির্বাচনী কার্যক্রম স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন প্রজ্ঞাপন জারি করে। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদীয় আসনের সীমানা সংক্রান্ত একটি মামলার কারণে পাবনা জেলার দুটি আসনের ভোট স্থগিত রাখা হয়েছে। এই স্থগিতাদেশ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে এবং পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত নির্বাচনী কার্যক্রম স্থগিত থাকবে।
নির্বাচনী এলাকা ৬৮ পাবনা-১ এবং ৬৯ পাবনা-২-এর ভোটার, প্রার্থী ও সাধারণ মানুষ এই স্থগিতাদেশে হতাশ এবং বিভ্রান্ত। তারা বলছেন, নির্বাচন স্থগিত হওয়া কারও জন্য কাম্য নয়। সাঁথিয়া উপজেলার ভোটার আলী হাসান বলেন, “আমরা হতাশ হয়েছি ইসির এমন সিদ্ধান্তে। নির্বাচনের এই সময়ে এসে ভোট স্থগিত হওয়া দুঃখজনক। আমরা চাই, নির্বাচনের জটিলতা সমাধান হোক এবং ভোট দিতে পারি।”
সুজানগরের বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ বলেন, “তফসিল ঘোষণার পর সীমানা নিয়ে দ্বন্দ্ব বিব্রতকর। এমন নজির আগে হয় নি। দীর্ঘ বছর আমরা ভোট দিতে পারিনি। এখন ভোট দেওয়ার সুযোগ পেতে মুখিয়ে আছি। এমন সময় ভোট স্থগিত করা হতাশার বিষয়।”
আব্দুল মোমিন অভিযোগ করেন, “একবার বলা হচ্ছে ভোট স্থগিত, আবার বলা হচ্ছে সঠিক নয়, এরপর আবার স্থগিত করা হলো। আমরা কি বুঝবো? ধোঁয়াশা ও আইনি জটিলতা কাটিয়ে নির্বাচন হওয়া উচিত। ভোট না হলে জনগণের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে।”
পাবনা-২ আসনের ভোটার সিদ্দিকুর রহমান বলেন, “নির্বাচন স্থগিতের খবর শুনে আমরা হতাশ হয়েছি। আশা করি দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে এবং নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ভোট না হলে প্রয়োজনে আমরা রাজপথে নামব।”
পাবনা-২ আসনের জামায়াতে ইসলামী মনোনীত এমপি পদপ্রার্থী অধ্যাপক কেএম হেসাব উদ্দিন বলেন, “মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ৬৮ পাবনা-১ ও ৬৯ পাবনা-২ আসনের নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। এটি স্থায়ী নয়, সাময়িক সময়ের জন্য। আমরা সকল নেতাকর্মী, সমর্থক ও ভোটারদের প্রতি অনুরোধ করছি, ধৈর্য ধরুন। নির্বাচনী কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলুক। শিগগিরই সমস্যার সমাধান হবে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ইনশাআল্লাহ।”
পাবনা-১ আসনের জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, “সরকারকে তিনটি ম্যান্ডেট দেওয়া হয়েছে। এর একটি হলো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। যে সীমানায় হোক, জনগণকে ভোট দেবার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। ভোটারদের মানসিক প্রস্তুতি রয়েছে। আমাদেরও প্রস্তুতি রয়েছে। যদি সীমানা সংক্রান্ত জটিলতা এখনও না সমাধান হয়, তা সবার জন্য অসুবিধাজনক। বার বার সিদ্ধান্ত বদলালে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। নির্বাচন কমিশনকে একটি স্থায়ী সমাধানে আসা উচিত।”
তিনি আরও বলেন, “পাবনা-১ ও ২ এর নির্বাচন স্থগিতের সিদ্ধান্ত বাতিল করতে নির্বাচন কমিশনকে ২৪ ঘণ্টার আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছে। আমাদের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। ভোটারদের সচেতন ও ধৈর্যশীল থাকা প্রয়োজন।”
পাবনা জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক শাহেদ মোস্তফা জানান, “নির্বাচন স্থগিতের বিষয়ে অফিসিয়ালি আদেশ পেয়েছি। সে অনুযায়ী গণ-বিজ্ঞপ্তি জারি করেছি। ৬৮ পাবনা-১ ও ৬৯ পাবনা-২ আসনের নির্বাচন পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত স্থগিত রাখার জন্য নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন।”
উল্লেখ্য, পূর্বে জেলার সাঁথিয়া উপজেলা সম্পূর্ণ ও বেড়া উপজেলার একাংশ নিয়ে পাবনা-১ আসন এবং সুজানগর উপজেলা সম্পূর্ণ ও বেড়া উপজেলার বাকি অংশ নিয়ে পাবনা-২ আসনের সীমানা নির্ধারিত ছিল।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাস করে নির্বাচন কমিশন গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর শুধুমাত্র সাঁথিয়া উপজেলাকে একক করে পাবনা-১ আসন এবং বেড়া ও সুজানগর উপজেলা নিয়ে পাবনা-২ আসন গঠন করে গেজেট প্রকাশ করে। এরপর রিট এবং পাল্টা রিটের কারণে নির্বাচনী কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে।
নির্বাচনী স্থগিতাদেশের ফলে প্রার্থী, ভোটার ও রাজনৈতিক দলগুলো অসুবিধায় পড়েছে। তারা আশা করছেন, নির্বাচন কমিশন দ্রুত সমস্যা সমাধান করবে। ভোটাররা বলছেন, তাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত না করলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আস্থা ক্ষুণ্ণ হবে।
স্থানীয়রা আরও উল্লেখ করেছেন, স্থগিতাদেশের কারণে ভোট প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী প্রচারণা পরিচালনা করতে পারছে না। এ কারণে প্রার্থী ও সমর্থকদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
পাবনা জেলার ভোটাররা নির্বাচন কমিশনের কাছে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের দাবি, নির্বাচনের ক্ষেত্রে জটিলতা থাকলেও তা দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন। ভোটাররা মনে করছেন, নির্বাচনের স্থগিতাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে থাকলে ভোটাধিকার হরণ হবে এবং জনগণকে অকারণ ঝুঁকিতে ফেলা হবে।
প্রার্থীরা বলছেন, “নির্বাচন কমিশনকে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে। বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। জনগণ এবং ভোটারদের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা জরুরি।”