সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি / : 112
রেজাউল করিম ঝন্টু
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় অবস্থিত প্রায় ৫০০ বছরের ঐতিহাসিক স্থাপনা ‘ইমামবাড়ি’ আজ দখল, অযত্ন, অবহেলা ও সংস্কারের অভাবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত এই স্থাপনাটি কালের সাক্ষী হয়ে থাকলেও সংরক্ষণের অভাবে এর অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে।
চলনবিল অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই ইমামবাড়িটি সুফি-সাধক হযরত শাহ ইমামের (রহঃ) স্মৃতিবিজড়িত। একসময় ধর্মীয় শিক্ষা, ইবাদত ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র ছিল এই ঐতিহাসিক স্থাপনা। বর্তমানে অযত্নে পড়ে থেকে ইট-সুরকির ভগ্নস্তূপে পরিণত হয়েছে এর অধিকাংশ অংশ। কারুকার্যখচিত দেয়াল, প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী ও ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো আজ লতাপাতার জঞ্জালে ঢাকা পড়ে গেছে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৫ শতকের দিকে ইয়েমেন থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে চলনবিলের নিভৃত পল্লি বারুহাস গ্রামে আগমন করেন সুফি-সাধক হযরত শাহ ইমাম (রহঃ)। তিনি এই অঞ্চলের হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ইসলামের বাণী ও আদর্শ প্রচার করেন। তার আধ্যাত্মিক প্রভাবে বহু মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তার ধর্মপ্রচার কার্যক্রমে মুগ্ধ হয়ে চতুর্থ মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর চলনবিল পরগনা পরিদর্শনে এসে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
সম্রাট জাহাঙ্গীর হযরত শাহ ইমামের (রহঃ) উদ্যোগে সন্তুষ্ট হয়ে সেখানে একটি মসজিদ, এবাদতের জন্য কয়েকটি পাকা ঘর নির্মাণ এবং একটি পুকুর খননের ব্যবস্থা করেন। পাশাপাশি ইসলাম প্রচারের কাজে সহায়তার জন্য তাকে ৮০ একর করমুক্ত জমি দান করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত হযরত শাহ ইমাম (রহঃ) এই ইমামবাড়িতেই বসবাস করেন। মৃত্যুর পর তাকে ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদের পূর্ব-উত্তর পাশে সমাহিত করা হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় ইমামবাড়ির একটি মসজিদ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। কেবল গম্বুজের মতো ছোট একটি ঘর কোনোভাবে দাঁড়িয়ে থাকলেও সেটি বড় গাছের আড়ালে প্রায় অদৃশ্য। জরাজীর্ণ দেয়ালে জন্মেছে লতাপাতা, যা স্থাপনাটির করুণ অবস্থারই সাক্ষ্য দিচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু স্থাপনাই নয়, ইমামবাড়ির সঙ্গে জড়িত অন্যান্য স্মৃতিচিহ্নও দখলের শিকার হচ্ছে। বারুহাস গ্রামের মোকাদ্দেস আলী বলেন, “ইমামবাড়ির প্রায় সব স্থাপনাই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সমাধির সামনে সাড়ে আট বিঘা আয়তনের একটি পুকুর ছিল, সেটিও স্থানীয় প্রভাবশালীরা দখল করে নিয়েছে।”
স্থানীয়রা দীর্ঘদিন ধরে এই ঐতিহাসিক স্থাপনা ও এর সঙ্গে জড়িত জমি উদ্ধারের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের প্রত্যাশা, সরকারিভাবে উদ্যোগ নিয়ে ইমামবাড়িটি সংরক্ষণ ও পুনর্নির্মাণ করা হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম চলনবিল অঞ্চলের এই গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস জানতে পারে।
এ বিষয়ে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান বলেন, “বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে খোঁজ-খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
আকাশজমিন / আরআর