৭৯টি সংসদীয় আসনে বিএনপির ৯২ জন বিদ্রোহী প্রার্থী ও জামায়াতে ইসলামীর একজন বিদ্রোহী প্রার্থী নির্বাচনের মাঠে রয়ে গেছেন। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন পার হয়ে গেলেও দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে এসব প্রার্থী ভোটের লড়াই থেকে সরে দাঁড়াননি। বহিষ্কার, সতর্কবার্তা ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগের পরও তাঁরা স্বতন্ত্র কিংবা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় থাকছেন।
মঙ্গলবার রাত ১২টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৯৮টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯৫টির হিসাব বিশ্লেষণ করে এই চিত্র পাওয়া গেছে। এতে দেখা যায়, ৭৯টি আসনে বিএনপির মোট ৯২ জন নেতা দলীয় মনোনয়ন ও সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হয়েছেন। কোনো কোনো আসনে একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় দলটির সাংগঠনিক সংকট আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর শুরুতে বিএনপির অন্তত ১১৭টি আসনে প্রায় ১৯০ জন নেতা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেন। তাঁদের মধ্যে কারও কারও মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ে বাতিল হয়েছে। আবার অনেকে শেষ পর্যন্ত মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করলেও বড় একটি অংশ অনড় অবস্থানে রয়েছেন। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে এখন পর্যন্ত অন্তত ১০ জন নেতাকে বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পর্যায়ের পদ-পদবি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীরও একজন বিদ্রোহী প্রার্থী নির্বাচনে রয়েছেন। তিনি ময়মনসিংহ-৬ (ফুলবাড়িয়া) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী অধ্যাপক জসিম উদ্দিন। তিনি জেলা জামায়াতের সাবেক আমির ছিলেন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হওয়ায় তাঁকে গত ২৯ ডিসেম্বর দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ছিল মঙ্গলবার। নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, ৩০০ সংসদীয় আসনে মোট ২ হাজার ৫৮২টি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে। এর মধ্যে অধিকাংশ আসনে চূড়ান্ত প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে পাবনা-১ ও পাবনা-২ আসনের নতুন তফসিল অনুযায়ী, ওই দুটি আসনে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময় রয়েছে আগামী ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বহিষ্কারের পরেও যুগপৎ আন্দোলনের শরিক ও সমমনাদের জন্য ছেড়ে দেওয়া আসনগুলোতে বিএনপির বহিষ্কৃত নেতারা প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি। বরং কেউ কেউ প্রকাশ্যে নির্বাচনে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন।
ঢাকা-১২ আসনে বিএনপি গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক দল বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হককে প্রার্থী করেছে। এই আসনে বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন পাওয়া ঢাকা মহানগর উত্তর কমিটির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম (নীরব) পরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন। দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কার্যক্রমের অভিযোগে তাঁকে গত ৩০ ডিসেম্বর বিএনপির সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হলেও তিনি নির্বাচনের মাঠ ছাড়েননি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনে বিএনপির সাবেক আন্তর্জাতিক বিষয়ক সহসম্পাদক রুমিন ফারহানাও মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি। এই আসনে বিএনপি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব জুনায়েদ আল হাবীবকে সমর্থন দিয়েছে। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে প্রার্থী হওয়ায় রুমিন ফারহানাকে বহিষ্কার করা হলেও তিনি শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নির্বাচনে রয়েছেন।
পটুয়াখালী-৩ আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য ও ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি হাসান মামুন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। এই আসনে গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি। দলীয় নির্দেশনা অমান্য করায় হাসান মামুনকে বহিষ্কার করা হয়।
ঝিনাইদহ-৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাইফুল ইসলাম ফিরোজ। তিনি ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সদস্য এবং জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এই আসনে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট করার জন্য গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. রাশেদ খাঁন বিএনপিতে যোগ দেন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় সাইফুল ইসলাম ফিরোজকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
সিলেট-৫ আসনে জেলা বিএনপির সহসভাপতি মামুনুর রশিদ প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি। এই আসন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সভাপতি মাওলানা মোহাম্মদ উবায়দুল্লাহ ফারুককে ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় মামুনুর রশিদকেও বহিষ্কার করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসন বিএনপি ছেড়ে দিয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মনির হোসেন কাসেমীর জন্য। তবে এখানে বিএনপির সাবেক কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ শাহ আলম ও মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন। তাঁদের দুজনকেই দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে বহিষ্কার করা হয়েছে।
যশোর-৫ আসনে উপজেলা বিএনপির সভাপতি শহীদ মো. ইকবাল হোসেন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি। এই আসন বাংলাদেশ জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতা মুফতি রশীদ বিন ওয়াক্কাছকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপিতে যোগ দেওয়া সৈয়দ এহসানুল হুদাকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও সেখানে কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য ও বাজিতপুর উপজেলা সভাপতি শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল প্রার্থী রয়েছেন। তিনি মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি।
এদিকে গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম শরিক দল নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নাকে একটি আসন ছেড়ে দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত থাকলেও এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তিনি ঢাকা-১৮ ও বগুড়া-২—দুটি আসনেই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। উভয় আসনেই বিএনপির প্রার্থী রয়েছে। অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা সত্ত্বেও মান্না জানিয়েছেন, তিনি দুই আসনেই লড়াই চালিয়ে যাবেন।