ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী স্থানীয় সরকারের বিকল্প নেই: ড. আবদুল মঈন খান স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা নেই: মীর শাহে আলম দুপুরের মধ্যেই বিদ্যুৎ পাচ্ছে বাংলাদেশ: কমবে লোডশেডিং এমপিও শিক্ষকদের নির্বাচন ভাগ্য নির্ধারণ করবে ইসি: মীর শাহে আলম সরকারি কেনাকাটায় পুকুরচুরি ঠেকাতে আসছে অভিন্ন একক দরতালিকা সাগর-রুনি হত্যার বিচার চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ তারুণ্য না অভিজ্ঞতা: ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্ব চয়নে জটিল হিসাব-নিকাশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জের রিট খারিজ হাইকোর্টে ইন্দোনেশিয়ায় ২৪০ যাত্রী নিয়ে জাহাজ নিখোঁজ ঠাকুরগাঁও সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত, আটক ২

চার বছর ধরে সংকোচনমুখী নীতি, তবু মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী


  • আপলোড সময় : বুধবার ২১ জানুয়ারী, ২০২৬ সময় : ২:১৩ পিএম

অনলাইন রিপোর্টার

দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও ফলাফল আসেনি, উল্টো নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম ও জ্বালানি তেলের দাম কমলেও বাংলাদেশে তা ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এছাড়া ডলার সংকট অনেকটাই সমাধান হলেও বাজারে নগদ টাকার সরবরাহ বেড়ে গেছে। এসবের মধ্যেও মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমছে না।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শে দীর্ঘদিন ধরে যে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করা হচ্ছে, তা দেশের বাস্তবতায় কার্যকর হয়নি। সুদহার বাড়িয়ে চাহিদা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হলেও মূল সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু—সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা ও বাজার কাঠামোর ত্রুটি—দূর হয়নি।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে সরকারি ব্যয়, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের খরচ, প্রবাসীদের রেমিট্যান্স প্রবাহ—all মিলিয়ে বাজারে নগদ অর্থের অতিরিক্ত সরবরাহ হয়েছে। তবে এর বড় অংশ অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার হওয়ায় চাহিদা বেড়ে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। নির্বাচনি ব্যয়ের এই প্রভাব সাময়িক হলেও বাজারে অর্থের অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।

২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে চাল, গম, পাম অয়েল, সয়াবিন তেল, চিনি, দুধের গুঁড়া ও জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। উদাহরণ হিসেবে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ২০ ডলার কমেছে। তবু বাংলাদেশে এ পণ্যের খুচরা মূল্য কমেনি, বরং বেড়েছে। এটি বাজারে প্রতিযোগিতার অভাব এবং দুর্বল তদারকির প্রমাণ।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, “পেঁয়াজ ও শাকসবজির দামের বৃদ্ধি দেখাচ্ছে দেশের কৃষি সরবরাহ ব্যবস্থা কতটা নাজুক। শুধু মুদ্রানীতি যথেষ্ট নয়; প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বাজার কাঠামো ও কার্যকর প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি।”

শীত মৌসুমে সবজির দাম কমার কথা ছিল, কিন্তু কৃষক পর্যায়ে দাম কমলেও ভোক্তা পর্যায়ে তার সুফল পৌঁছায়নি। সরবরাহ চেইনের মধ্যবর্তী স্তরে অসঙ্গতি প্রকাশ পেয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩ সাল থেকে ধারাবাহিক সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। সুদের হার ১০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল চাহিদা কমিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। তবে উচ্চ সুদের কারণে বেসরকারি খাত চাপে পড়েছে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি কমেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশে সুদহার বৃদ্ধির প্রভাব আগে যেমন কার্যকর ছিল, এখন তেমন নেই। আইএমএফের সুদহার বৃদ্ধির প্রেসক্রিপশন দেশের বাস্তবতায় ফলপ্রদ নয়।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, “মূল্যস্ফীতি চাহিদাজনিত নয়। সুদহার বাড়িয়ে নীতি কার্যকর হয়নি। সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটি, বাজার ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে। নির্বাচন ঘিরে সরকার, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও সামাজিক সংগঠনগুলোর বাড়তি ব্যয়ের ফলে বাজারে অর্থ প্রবাহ বাড়ছে। তার বড় অংশ অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হওয়ায় দাম বাড়ছে।”

অর্থনীতিবিদ মামুন রশীদও মনে করেন, বাংলাদেশে বর্তমান মূল্যস্ফীতি মূলত সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বাজার ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার ফল। বাজার সিন্ডিকেট, কৃত্রিম সংকট এবং দুর্বল তদারকি মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘস্থায়ী করছে।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে নির্বাচন কমিশনের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২ হাজার ৭২৭ কোটি পরিচালন ব্যয় এবং ২২৯ কোটি উন্নয়ন ব্যয়। নির্বাচনের কারণে ব্যয় আরও ২০ শতাংশ বাড়তে পারে। প্রচারণার জন্য প্রার্থীদের পোস্টার, ব্যানার, ডিজিটাল শোডাউন ও সোশ্যাল মিডিয়া খরচ বেড়েছে, যা বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়াচ্ছে।

প্রার্থীরা ভোটারপ্রতি সর্বোচ্চ ১০ টাকা বা সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা খরচ করতে পারবেন। তবে বাস্তবে এই খরচ কয়েকগুণ বেশি হয়, যার বড় অংশ আসে কালোটাকা থেকে। দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৩৮ শতাংশ কালোটাকার, যা প্রায় ১২ লাখ কোটি টাকা।

জানুয়ারি মাসের প্রথম ১৯ দিনে রেমিট্যান্স এসেছে ২ বিলিয়ন ১২৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা গত বছরের তুলনায় ৫৬ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট রেমিট্যান্স এসেছে ১৮ বিলিয়ন ৩৮৮ মিলিয়ন ডলার, আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৫ বিলিয়ন ১৩৭ মিলিয়ন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে ৪৭ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা ছেড়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম দিকে খাদ্য মূল্যস্ফীতি প্রায় ১১ শতাংশে পৌঁছেছিল। বছরের শেষ তিন মাসে বিশেষ করে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ১৭০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। সবজির বাজার অস্থির ছিল, অধিকাংশ সময় ১০০ টাকার নিচে পাওয়া যায়নি।

আইএমএফ, স্ট্যাটিস্টা ও জেপি মরগান অনুসারে ২০২৫ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি গড় ৩–৪.৫ শতাংশে নেমে এসেছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু বাংলাদেশে একই সময়ে প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি প্রমাণ করে মূল সমস্যা চাহিদার অতিরিক্ত চাপ নয়, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা ও বাজার কাঠামোর ত্রুটি।

চার বছর ধরে সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি কার্যকর হয়নি। সুদহার বৃদ্ধি, টাকার প্রবাহ কমানো ও জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির মতো পদক্ষেপ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর হস্তক্ষেপ ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন।

 


 


এ সম্পর্কিত আরো খবর