অনলাইন রিপোর্টার
দেশের স্বর্ণবাজারে রেকর্ড দর বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে—স্বর্ণের ভরি কি খুব শিগগিরই ৩ লাখ টাকা ছাড়াবে? আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিহাসে প্রথমবার প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ডলার ছাড়ানোর পর বাংলাদেশের বাজারেও তার প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) অনুযায়ী, ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৬২ হাজার ৪৪০ টাকায়, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বিবেচনায় স্বর্ণের ভরি ৩ লাখ টাকার কাছাকাছি পৌঁছানো এখন অসম্ভব নয়। তবে এর গতি আন্তর্জাতিক বাজার, ডলারের বিনিময় হার এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার ওপর নির্ভর করবে।
আন্তর্জাতিক বাজার থেকে স্থানীয় প্রভাব
২৬ জানুয়ারি বিশ্ববাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম প্রথমবারের মতো প্রায় ৫ হাজার মার্কিন ডলার ছুঁয়েছে। ১ আউন্সে ৩১.১০৩৫ গ্রাম থাকে। বাংলাদেশের প্রচলিত হিসাবে এক ভরি ১১.৬৬৪ গ্রাম। আন্তর্জাতিক দরের প্রতি ভরির মৌলিক মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা। তবে এতে দেশীয় বাজারে আরও খরচ যোগ হয়—তেজাবি (রিফাইন্ড) স্বর্ণের দাম, আমদানির খরচ, ঝুঁকি প্রিমিয়াম, ভ্যাট ও অন্যান্য সরকারি কর, বাজার ব্যবস্থাপনা ও মজুত ব্যয়। সব যোগ করে বাজুস ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৬২ হাজার ৪৪০ টাকা নির্ধারণ করেছে।
২০২৪ সালের আগস্টে দেশের বাজারে ভরি মূল্য ছিল প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। দেড় বছরে দাম বেড়ে ২ লাখ ৬২ হাজার টাকায় পৌঁছেছে, যা প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি।
দাম বাড়ার প্রধান কারণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, দাম বাড়ার তিনটি প্রধান কারণ হলো—
১. ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে স্বর্ণের দিকে টানে।
২. সুদের হার কমার প্রত্যাশা: সুদের হার কমে অন্যান্য বিনিয়োগের রিটার্ন কমায় স্বর্ণের চাহিদা বেড়ে যায়।
৩. ডলারের দুর্বলতা: ডলারের দুর্বলতা স্বর্ণকে তুলনামূলকভাবে সস্তা করে, বৈশ্বিক চাহিদা বাড়ায়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ব্যাপক স্বর্ণ ক্রয় ও স্বর্ণভিত্তিক এক্সচেঞ্জ–ট্রেডেড ফান্ডে (ইটিএফ) বিনিয়োগও দামের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাকে সহায়তা করছে।
দেশের বাজারে প্রভাব
দেশের বাজারে বাজুস আন্তর্জাতিক দরের সঙ্গে ডলারের বিনিময় হার ও স্থানীয় খরচ বিবেচনায় দাম সমন্বয় করে। সোমবার (২৬ জানুয়ারি) বাজুস ভরিতে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ২৪৯ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। মঙ্গলবার থেকে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি দাঁড়ায় ২ লাখ ৬২ হাজার ৪৪০ টাকায়। ২১ ক্যারেটের দাম ২ লাখ ৫০ হাজার ৪৮৪ টাকা, ১৮ ক্যারেট ২ লাখ ১৪ হাজার ৭৩৪ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণ ১ লাখ ৭৬ হাজার ৫৯৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম যদি ৫ হাজার ডলারের ওপরে স্থিতিশীল থাকে, তাহলে দেশের বাজারে নতুন দাম বাড়ার চাপ তৈরি হবে।
সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব
স্বর্ণের এই ঊর্ধ্বমূল্য মধ্যবিত্ত ও সাধারণ মানুষের ওপর চাপ তৈরি করছে। বিয়েতে গয়না ব্যবহার কমছে, অনেক পরিবার ক্রয় সংযত করছে। স্বর্ণভিত্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কারিগররাও সংকটে পড়ছেন। পাবনার স্বর্ণ ব্যবসায়ী আবদুল কাদের জানিয়েছেন, আগামী তিন মাসের মধ্যে প্রতি ভরি স্বর্ণ ৩ লাখ টাকায় পৌঁছাতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, মূল্যস্ফীতি বাড়লে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা বাড়ছে, যা দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশ্লেষক মত
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক উত্তেজনা, ডলারের দুর্বলতা এবং নিরাপদ বিনিয়োগের প্রবণতা অব্যাহত থাকলে স্বর্ণের ভরি ৩ লাখ টাকা ছুঁতে পারে। তবে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা কমলে বা সুদের হার দীর্ঘ সময় উচ্চ থাকলে সাময়িক সংশোধন বা স্থিতিশীলতা আসতে পারে।
সব মিলিয়ে, স্বর্ণের দাম বৈশ্বিক ও দেশের অর্থনীতির চাপ ও বিনিয়োগকারীদের মানসিকতার প্রতিফলন। তাই প্রশ্ন এখন শুধু কৌতূহলের নয়—স্বর্ণের ভরি ৩ লাখ ছাড়াবে কিনা, সেটি অর্থনীতির ভবিষ্যৎ ইঙ্গিত।
আকাশজমিন / আরআর