ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
‘ট্রফি চোর’ অপবাদ মাথায় নিয়ে শান্ত মেজাজে মাঠ ছাড়লেন নাকভি ২৩ বছরের খরা কাটল না আমেরিকার, ইউএস ওপেনের ট্রফি জভেরেভের হাতে পুরুষদের পর মেয়েরাও বর্জন করল নাকভিকে, দুবাইতে আবারও ট্রফি নাটক রাজধানীর বেসরকারি হাসপাতালে শিশু মৃত্যুর পর তুলকালাম বিশ্বের দূষিত বায়ুর তালিকায় শীর্ষে সিঙ্গাপুর সিটি,ঢাকা ষষ্ঠ আসিফ মাহমুদের আমলের সব নিয়োগ ও পদোন্নতির নথি এখন দুদকে পঞ্চগড়ে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ: আহত ১৫, ২ ঘণ্টা মহাসড়ক অবরুদ্ধ অল্পের জন্য বাঁচলেন আন্তর্জাতিক নেতারা ৩৬ ঘণ্টা পর নিহত বাংলাদেশি যুবকের মরদেহ ফেরত দিলো বিএসএফ শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ

এক বছরে ১৭ লাখ অপ্রয়োজনীয় সিজার

বাংলাদেশে বিলুপ্তির পথে স্বাভাবিক প্রসব

বছরে ক্ষতি পাঁচ হাজার কোটি টাকা


  • আপলোড সময় : বৃহস্পতিবার ২৯ জানুয়ারী, ২০২৬ সময় : ৯:১০ এএম

গত এক বছরে দেশে প্রায় ১৭ লাখ শিশুর জন্ম হয়েছে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে। এতে একদিকে যেমন মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের কারণে বছরে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। আন্তরিকতার অভাব, পর্যাপ্ত নজরদারির ঘাটতি এবং আর্থিক লাভের মানসিকতার কারণে দেশে সন্তান জন্মদানে অস্ত্রোপচারের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে।

বুধবার অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার কমানো বিষয়ক একটি গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়। ‘রিডিউসিং আননেসেসারি সিজারিয়ান সেকশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই সভার আয়োজন করে আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতাল (এডব্লিউসিএইচ)। অনুষ্ঠানে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপনের পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার কমাতে বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরা হয়।

সভায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. সাঈদুর রহমান বলেন, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে দেশে এখনো অনেক গাফিলতি রয়ে গেছে। শিশুজন্মে অস্ত্রোপচারের হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় মায়েরা বাড়তি ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন। তিনি বলেন, বাস্তবতা হলো দেশে এখন স্বাভাবিক প্রসব প্রায় নেই বললেই চলে, যা ভবিষ্যতের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।

আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালের চিকিৎসক অধ্যাপক আনজুমান আরা অনুষ্ঠানে গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ৩৫ লাখ শিশুর জন্ম হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৬ লাখ ৮০ হাজার শিশুর জন্ম হয়েছে অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে। বৈশ্বিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি পাঁচটি শিশুর জন্মের মধ্যে একটি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে হয়, যা প্রায় ২১ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশে এই হার প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি। দেশে প্রতি দুইটি শিশুর জন্মের মধ্যে প্রায় একটি শিশুর জন্ম হচ্ছে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে, যার হার ৪৫ থেকে ৫২ শতাংশের মধ্যে।

অধ্যাপক আনজুমান আরা বলেন, বেসরকারি হাসপাতালগুলো এই পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রতি ১০টি শিশুর জন্মের মধ্যে প্রায় ৮ থেকে ৯টিই হচ্ছে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে, যার হার ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ। তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশে প্রয়োজনীয় জনবল, জরুরি চিকিৎসা সুবিধা কিংবা মানসম্মত লেবার রুম নেই। অথচ আর্থিক লাভকে প্রাধান্য দিয়ে অস্ত্রোপচারকে সহজ ও দ্রুত সমাধান হিসেবে বেছে নেওয়া হচ্ছে।

২০১৮ সালের একটি গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে অধ্যাপক আনজুমান আরা বলেন, অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের কারণে প্রতিবছর পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। দেশের বেসরকারি মাতৃসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর ৭০ শতাংশের বেশি পর্যাপ্ত তদারকি ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানে অনেক সময় জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা না থাকলেও অস্ত্রোপচার করা হচ্ছে, যা মা ও শিশুর জীবনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।

অনুষ্ঠানে আয়োজকদের পক্ষ থেকে দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, ১৯৯৯ সালে হাসপাতালে সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের হার ছিল ৩০ শতাংশ। ২০০৭ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫১ শতাংশে এবং ২০২২ সালে এই হার ৬৯ শতাংশে পৌঁছায়। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে হাসপাতালে সন্তান প্রসবের ৯০ শতাংশই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে হবে।

আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালের ধাত্রীবিদ্যা ও স্ত্রীরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ফেরদৌসী বেগম বলেন, স্বাভাবিক প্রসবকে ইচ্ছাকৃতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ও অতিরিক্ত যন্ত্রণাদায়ক হিসেবে উপস্থাপন করায় গর্ভধারিণী মায়েদের মধ্যে অযৌক্তিক ভয় তৈরি হচ্ছে। তিনি বলেন, ১৯৯০ সালে মায়েরা অস্ত্রোপচার না করার কারণে মারা যেতেন, আর এখন অতিরিক্ত অস্ত্রোপচারের কারণেই মায়েরা মারা যাচ্ছেন। এই পরিবর্তন সমাজ ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য একটি ভয়াবহ বার্তা বহন করছে।

আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালের শিশুরোগ বিভাগের চিকিৎসক ও গবেষণা পরিচালক অধ্যাপক খুরশীদ তালুকদার বলেন, স্বাভাবিক প্রসবে সময় লাগে, কিন্তু অধিকাংশ রোগী ও চিকিৎসকই এই স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সময় দিতে চান না। দ্রুত প্রসব সম্পন্ন করার মানসিকতা থেকে অস্ত্রোপচারকে সহজ পথ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।

প্রচলিত একটি ভুল ধারণার কথা উল্লেখ করে অধ্যাপক খুরশীদ তালুকদার বলেন, অনেকেই মনে করেন স্বাভাবিক প্রসবের কারণে শিশুর মস্তিষ্কে ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নবজাতকের মস্তিষ্কে ক্ষতির প্রায় ৭০ শতাংশই ঘটে প্রসবের আগেই, যা প্রসব-পূর্ব সেবার ঘাটতির ফল। প্রসবকালীন সমস্যার কারণে মস্তিষ্কের ক্ষতি হয় ১০ শতাংশেরও কম।

স্বাভাবিক প্রসবের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়া শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গঠনে এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মায়ের শরীরের উপকারী জীবাণু বা মাইক্রোবায়োম শিশুর শরীরে স্থানান্তরের প্রধান মাধ্যম হলো স্বাভাবিক প্রসব। একই সঙ্গে এতে জন্মের পরপরই মায়ের সঙ্গে শিশুর স্কিন-টু-স্কিন কন্ট্যাক্ট নিশ্চিত হয়, যা শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশের জন্য অপরিহার্য। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া শিশুরা এসব মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়।

অনুষ্ঠানে আরও জানানো হয়, ২০০৮ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে প্রসবের হার ছিল ৬২ থেকে ৭২ শতাংশ। পরবর্তীতে সেখানে প্রসব-পূর্ব কাউন্সেলিং, রোবসন শ্রেণিবিন্যাস, লেবার মনিটরিং, কনসালট্যান্ট অডিট এবং আগের সিজারিয়ানের পর স্বাভাবিক প্রসব (ভিএবিসি) পদ্ধতি চালু করা হয়। এর ফলে হাসপাতালটিতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের হার কমিয়ে ৪২ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

২০২২-২৩ সালে গেটস ফাউন্ডেশনের সহায়তায় এই মডেল আটটি প্রতিষ্ঠানে সম্প্রসারণ করা হলেও আশানুরূপ সাফল্য পাওয়া যায়নি বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কার্যকর নজরদারি, নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার কমানো সম্ভব নয়।

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক মো. আবু জাফর উপস্থিত ছিলেন। সভাপতিত্ব করেন আশুলিয়া নারী ও শিশু হাসপাতালের চিকিৎসক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দবির উদ্দিন আহমেদ।

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর