দীর্ঘ ১৯ বছর পর নিজ জন্মভূমি বগুড়ায় ফিরে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) দিবাগত রাত আনুমানিক ১২টার দিকে বগুড়া শহরের ঐতিহাসিক আলতাফুনেছা খেলার মাঠে অনুষ্ঠিত নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন তিনি। দীর্ঘদিন পর নিজ এলাকার মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় আবেগ ধরে রাখতে পারেননি বিএনপির এই শীর্ষ নেতা।
বক্তব্যের শুরুতেই তিনি মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করেন। তারেক রহমান বলেন, প্রায় দুই দশক পর আল্লাহ আমাকে আবার আমার নিজের মাটিতে ফিরে আসার তৌফিক দিয়েছেন। নিজের ঘরে ফিরে কী বলব, তা নিজেও ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। তিনি বলেন, বগুড়া শুধু একটি জেলা নয়, এটি তার শিকড়, তার পরিচয় এবং তার আবেগের জায়গা।
দীর্ঘদিন পর বগুড়াবাসীর সামনে দাঁড়িয়ে অতীত স্মৃতির কথা তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ১৯ বছর আগে যখন দেশে ছিলাম, তখন বগুড়ার মানুষের প্রয়োজন ও চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়নমূলক কাজ বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছি। শতভাগ সফল হওয়া সম্ভব হয়নি, তবে সরকারের আইন-কানুন ও সীমাবদ্ধতার মধ্য থেকেই যতটুকু করা সম্ভব ছিল, তা করার আন্তরিক চেষ্টা ছিল।
বগুড়ার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, বনানী-মাটিডালি সড়ক প্রশস্তকরণ, শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ স্থাপন, গ্যাস সংযোগসহ নানামুখী অবকাঠামোগত উন্নয়ন মানুষের চাহিদার ভিত্তিতেই বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। তিনি বলেন, এসব প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করা এবং নাগরিক সুবিধা বাড়ানো।
তিনি আরও বলেন, বগুড়াকে আমি সবসময় একটি মডেল জেলা হিসেবে বিবেচনা করেছি। কারণ, দেশের বাকি ৬৩টি জেলাকে কীভাবে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়নের আওতায় আনা যায়, তার বাস্তব উদাহরণ তৈরি হয়েছিল বগুড়ায়। মানুষের মৌলিক চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে ধাপে ধাপে অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল, যাতে মানুষ স্থানীয় পর্যায়েই প্রয়োজনীয় সেবা পেতে পারে।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়ের স্মৃতিচারণ করে তারেক রহমান বলেন, ওই সময়ে বগুড়ার সাতটি সংসদীয় আসনেই দেশের অন্যান্য জেলার তুলনায় বেশি উন্নয়নমূলক কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। সে কারণেই বগুড়াকে তিনি নিজের কাছে একটি আদর্শ ও মডেল জেলা হিসেবে দেখেন। তিনি বলেন, সেই সময় বগুড়ায় এমন একটি কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে মানুষের অধিকাংশ প্রয়োজন স্থানীয়ভাবেই পূরণ হতো।
তারেক রহমান বলেন, চিকিৎসা, শিক্ষা কিংবা অন্যান্য জরুরি সেবার জন্য মানুষকে খুব বেশি ঢাকামুখী হতে হতো না। স্থানীয় পর্যায়ে উন্নত চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যবস্থা থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ছিল তুলনামূলক স্বস্তির। তিনি বলেন, ভবিষ্যতেও এমন ব্যবস্থাই গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে মানুষ নিজ এলাকার মধ্যেই সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা পায়।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, এই নির্বাচন শুধু একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি নির্ধারণ করবে দেশে জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে কি না। তিনি বলেন, এই নির্বাচন দেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি আরও বলেন, গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হলে ১২ তারিখের নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য তিনি জনগণের প্রতি সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। তারেক রহমান বলেন, ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে জনগণই ঠিক করবে দেশের ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে।
এলাকার উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অতীতে বগুড়ার সংসদ সদস্য ছিলেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। বর্তমানে তিনি অনুপস্থিত থাকলেও একজন এলাকার সন্তান ও ভাই হিসেবে বগুড়াবাসীর পাশে থাকতে চান তিনি। বগুড়ার মানুষের সুখ-দুঃখে সবসময় পাশে থাকার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তারেক রহমান।
গত ১৫ বছরের বঞ্চনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, শুধু বগুড়াই নয়, এই সময়ে প্রকৃত অর্থে পুরো বাংলাদেশই বঞ্চিত ছিল। মানুষের ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, এসব বঞ্চনার অবসান ঘটাতে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে আল্লাহ যদি বিএনপিকে দেশ পরিচালনার সুযোগ দেন, তাহলে বগুড়ার পাশাপাশি সমগ্র দেশকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া হবে। উন্নয়ন, গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
এদিন আলতাফুনেছা খেলার মাঠে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে জনসভাটি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিন পর তারেক রহমানকে কাছে পেয়ে বগুড়াবাসীর মধ্যে দেখা যায় ব্যাপক উচ্ছ্বাস, আবেগ ও উদ্দীপনা। অনেককে চোখের জল ফেলতেও দেখা যায়।
সবশেষে তারেক রহমান সাতজন প্রার্থীর হাতে ধানের শীষ প্রতীক তুলে দিয়ে তাদের পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি সকল প্রার্থীর জন্য জনগণের দোয়া ও সমর্থন কামনা করেন এবং শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচনি কার্যক্রম পরিচালনার আহ্বান জানান।
আকাশজমিন / আরআর