রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে মাত্র কয়েক মুহূর্তের অসতর্কতায় অপহরণের শিকার হয় তিন বছরের শিশু হিসান রহমান। মায়ের কাছে পানি পান করতে চাওয়াই শেষ পর্যন্ত কাল হয়ে দাঁড়ায় শিশুটির জন্য। রিকশায় সন্তানকে বসিয়ে পানি আনতে যাওয়ার সুযোগে চালক কৌশলে শিশুটিকে নিয়ে পালিয়ে যায়। র্যাবের তদন্তে উঠে এসেছে, পাচারের উদ্দেশ্যেই হিসানকে অপহরণ করা হয়েছিল। আলোড়ন সৃষ্টি করা এই ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই অপহরণকারী চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব।
গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী। তিনি বলেন, প্রাথমিক তদন্তে এটি একটি সংঘবদ্ধ অপহরণ চক্রের কাজ বলে প্রমাণ মিলেছে।
গ্রেপ্তার চারজন হলেন রিকশাচালক চাঁন মিয়া, তার বাবা নূর মোহাম্মদ, মা চাঁন মালা এবং স্ত্রী কুলসুম বেগম। র্যাব জানায়, অপহরণের পরপরই শিশুটিকে ঢাকার বাইরে পাঠানো হয় এবং পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় তাকে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ এলাকায় রাখা হয়েছিল।
সংবাদ সম্মেলনে উইং কমান্ডার ইন্তেখাব চৌধুরী জানান, গত বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে হিসানকে নিয়ে তার মা সুমাইয়া আক্তার মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান। চিকিৎসা শেষে মৌচাক মার্কেটের দিকে যাওয়ার সময় তারা একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় ওঠেন। পথে হিসান পানি পান করতে চাইলে মা শিশুটিকে রিকশায় বসিয়ে কাছেই পানি কিনতে যান। সেই সুযোগে রিকশাচালক চাঁন মিয়া দ্রুত রিকশা চালিয়ে পালিয়ে যায়।
র্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, অপহরণের পর চাঁন মিয়া শিশুটিকে পাচারের উদ্দেশ্যে ঢাকার বাইরে পাঠানোর পরিকল্পনা করে। তার নিকট আত্মীয় আজাদের মাধ্যমে শিশুটিকে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে পাঠানো হয়। তদন্তকারীদের ধারণা, পার্শ্ববর্তী দেশে পাচারের লক্ষ্যেই এই অপহরণ করা হয়েছিল।
র্যাবের মুখপাত্র জানান, সন্তানকে খুঁজে না পেয়ে ভুক্তভোগী মা সুমাইয়া আক্তার মুগদা থানায় একটি অপহরণ মামলা করেন। এরপর র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা, র্যাব-৩ এবং র্যাব-১৩ যৌথভাবে অভিযান শুরু করে। বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকার ওয়্যারলেস গেট গ্র্যান্ড প্লাজা এলাকা থেকে চাঁন মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে তার বাবা, মা ও স্ত্রীকে আটক করা হয়।
র্যাবের এক কর্মকর্তা জানান, গ্রেপ্তার চাঁন মিয়ার বিরুদ্ধে আগেও একাধিক অপরাধের তথ্য রয়েছে। তার বিরুদ্ধে গাইবান্ধা থানায় নিজের সন্তান হত্যার অভিযোগে মামলা ছিল এবং সেই মামলায় তিনি কিছুদিন কারাগারেও ছিলেন। জামিনে মুক্ত হয়ে ঢাকায় এসে বসবাস শুরু করেন তিনি। এর আগেও তিনি মাদকসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক র্যাব কর্মকর্তা বলেন, গ্রেপ্তার চার আসামি জিজ্ঞাসাবাদে অপহরণের বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিয়েছে। তবে অর্থের বিনিময়ে অপহরণ হলে পরিবার থেকে মুক্তিপণ দাবি করা হতো। সে ধরনের কোনো আলামত না পাওয়ায় পাচারের উদ্দেশ্যকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জানা গেছে, শিশুটির বাবা সুইজারল্যান্ড প্রবাসী। পরিবারটি আগে সেখানে বসবাস করত। প্রায় এক বছর আগে মা ও সন্তানরা দেশে ফিরে রাজধানীর সবুজবাগ দক্ষিণগাঁও এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতে শুরু করে। সুমাইয়া আক্তার পেশায় একজন ফিজিওথেরাপিস্ট।
মুগদা থানার ওসি শরিফুল ইসলাম জানান, গ্রেপ্তার চার আসামিকে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। আজ শনিবার তাদের আদালতে হাজির করে রিমান্ড আবেদন করা হবে। চক্রের অন্য সদস্য এবং অপহরণের প্রকৃত উদ্দেশ্য জানতে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।