হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলায় সংরক্ষিত কৃষিজমি ও গ্রামীণ রাস্তাঘাট এখন ভূমি খেকো চক্রের দখলে চলে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার মিরপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিরাতে অবৈধ ভেকু (এক্সকাভেটর) মেশিন দিয়ে ব্যাপকভাবে মাটি কাটা হচ্ছে। এতে একদিকে কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন ও প্রকৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে মাটিবাহী ভারী ট্রাকের অবাধ চলাচলে গ্রামীণ রাস্তাঘাট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দিনের আলো নিভলেই শুরু হয় ভেকু মেশিনের গর্জন। রাতভর চলে মাটি কাটার কাজ। এসব মাটিবাহী ড্রাম ট্রাক ও ট্রাক্টরের বেপরোয়া চলাচলে গ্রামের পাকা রাস্তায় বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। অনেক স্থানে যান চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। শুষ্ক মৌসুমে উড়ে আসা ধুলোবালি জনজীবনকে অতিষ্ঠ করছে। শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থদের স্বাভাবিক চলাফেরা এখন চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, তারা ব্যক্তিগতভাবে ফোন ও বার্তার মাধ্যমে ইউএনও-কে বিষয়টি জানিয়েছিলেন, তবে অবৈধ মাটি কাটা বন্ধ হয়নি। বারবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবগত করা হলেও রহস্যজনক কারণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। একজন ভুক্তভোগী বলেন, “আমরা বারবার স্যারকে কল দিয়েছি, মেসেজ দিয়েছি। কিন্তু মাটি কাটা থামছে না। মনে হচ্ছে ভূমি খেকোরা প্রশাসনের ছত্রছায়ায় অভয় পেয়েছে। আমাদের রাস্তা শেষ, ধুলোয় আমরা শ্বাস নিতে পারছি না।”
এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তাকে পুঁজি করে ভূমি খেকো চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। স্থানীয়রা প্রশ্ন তুলেছেন—আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রভাবে কি অবৈধ মাটিকারবারিদের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে? যেখানে কৃষিজমি রক্ষা ও পরিবেশ সংরক্ষণ প্রশাসনের মূল দায়িত্ব, সেখানে ইউএনও’র নীরবতা সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ ও সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।
আইন অনুযায়ী কৃষিজমি থেকে মাটি কাটা বা জমির শ্রেণি পরিবর্তন দণ্ডনীয় অপরাধ। অথচ বাহুবলে প্রকাশ্যেই ফসলি জমির উর্বর মাটি কেটে বিক্রি করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে এলাকার কৃষি উৎপাদন ও পরিবেশের জন্য ভয়াবহ সংকট ডেকে আনতে পারে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন এলাকাবাসী। জনস্বার্থ ও পরিবেশ রক্ষায় তারা অবিলম্বে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
বাহুবল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লিটন চন্দ্র দে বলেন, “মাটি কেকোদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয় না, কারণ সব সময় পুলিশ পাওয়া যায় না। আমরা অভিযান পরিচালনা করি, মোবাইল কোর্টও করা হয়। তবে পুলিশ ইচ্ছা করলে নিয়মিত মামলা দিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারতো। আমার জানামতে বাহুবলে যোগদানের পর পুলিশ কোনো অভিযান পরিচালনা করেনি। যদি অভিযান দিত, মাটি কাটা বন্ধ করা যেত। তবে আমরা অভিযান পরিচালনা করব।”
বাহুবল মডেল থানার ওসি মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “মাটি কাটার সংবাদ পেলে পুলিশ ঘটনাস্থলে যাওয়ার আগেই মাটি কেকোরা পালিয়ে যায়। নির্বাচনের কারণে ঠিকমতো অভিযান সম্ভব হচ্ছে না। নির্বাচনের পরে আমরা শক্তিশালী অভিযান পরিচালনা করব।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিরাতে অবৈধ মাটি কাটা ও ভারী ট্রাক চলাচলের কারণে গ্রামীণ রাস্তাঘাট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক স্থানে যান চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে, স্কুলে যাওয়া-আসা, বাজার চলাচল ও জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। শিশু ও বৃদ্ধরা ধুলোবালিতে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। জনজীবন ব্যাহত হচ্ছে, যা এলাকায় সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করেছে।
এলাকাবাসী মনে করছেন, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ভূমি খেকোদের বেপরোয়া কার্যকলাপকে উৎসাহ দিচ্ছে। নির্বাচনের আগে এই পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। তারা দাবি করেছেন, প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে মাটি কাটার অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করুক, কৃষিজমি ও গ্রামীণ রাস্তা রক্ষা করুক।
স্থানীয়দের বক্তব্য, “আমরা চাই প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ নিক। কোন নির্বাচন, কোন প্রভাব আমাদের গ্রামকে ধ্বংস করতে পারবে না। সংরক্ষিত কৃষিজমি আমাদের দেশের শস্য উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতির রক্ষাকবচ। যদি এই চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, ভবিষ্যতে কৃষি ও পরিবেশ উভয়ই বিপন্ন হবে।”
অভিযুক্ত ভূমি খেকোদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে স্থানীয়রা আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তারা বলছেন, প্রশাসন যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে তারা আইনত ও সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের দাবী আদায় করবেন।
সচেতন মহল মনে করছেন, বাহুবলে মাটি কাটা বন্ধ না হলে দীর্ঘমেয়াদে গ্রামের কৃষিজমি ও গ্রামীণ রাস্তা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এটি শুধু এক এলাকার নয়, জাতীয় অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হিসেবে দেখা দিতে পারে।
আকাশজমিন / আরআর