চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিকদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে বন্দরের কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে অচল হয়ে গেছে। বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) আরব আমিরাত ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওর্য়াল্ডকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ডাকে এই কর্মসূচি চলছে।
বন্দর জেটি, টার্মিনাল, শেড ও ইয়ার্ডে কোনো কার্যক্রম চালু নেই। কনটেইনার ও খোলা পণ্য ওঠানো-নামানোসহ সব ধরনের কার্যক্রম স্থগিত আছে। এছাড়া আমদানি পণ্যের ডেলিভারি, জেটিতে জাহাজে ওঠানো-নামানো, অফডক থেকে কনটেইনার আনা-নেওয়া এবং বন্দরের ভেতরে পণ্যবাহী গাড়ির চলাচলও বন্ধ রয়েছে।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর জানান, সরকার যতক্ষণ পর্যন্ত ইজারা প্রক্রিয়া থেকে সরে আসবে না, ততক্ষণ এই কর্মসূচি চলবে। তিনি বলেন, ‘আমরা শ্রমিকদের অধিকার ও বন্দরের স্বার্থ রক্ষার জন্য দৃঢ় অবস্থান নিয়েছি। ইজারা বাতিল না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি চলবে।’
এই কর্মসূচি শনিবার থেকে শুরু হয়। প্রথমে তিন দিন ধরে প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে শ্রমিকরা কর্মবিরতিতে অংশগ্রহণ করেন। সোমবার কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতির ডাক দেওয়া হয়। বুধবার বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. ইব্রাহিম খোকন ঘোষণা দেন, শ্রমিকরা অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি চালাবেন।
এদিকে, আন্দোলনের প্রথমদিনে বন্দরের কর্তৃপক্ষ আন্দোলনে যুক্ত চারজনকে তাৎক্ষণিকভাবে বদলি করে। এছাড়া রাজস্ব ক্ষতি নিরূপণের জন্য ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। রবিবার আরও ১২ কর্মচারীকে বদলি করা হয়। সোমবার ১৫ কর্মচারীকে নতুন করে মোংলা ও পায়রা বন্দরে বদলি করা হয়। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক অফিস আদেশে এ বিষয়ে তথ্য জানানো হয়।
শ্রমিকরা দাবি করেছেন, ডিপি ওর্য়াল্ডের ইজারা বন্দরের স্বার্থবিরোধী এবং এটি স্থানীয় শ্রমিকদের অধিকার হরণ করবে। তারা বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে তারা বন্দরের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে এবং কোনো ধরণের বৈষম্য ও বঞ্চনা বরদাস্ত করবেন না।
চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বিভিন্ন শিল্প ও বাণিজ্য সংস্থা সরবরাহে সমস্যায় পড়ছে। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় ব্যবসায়িক কার্যক্রমও স্থবির হয়ে গেছে। বন্দরের আউটপুট কমে যাওয়ায় দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব পড়ছে।
শ্রমিকদের এই আন্দোলন পুরো বন্দরে উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। তাদের বক্তব্য, ‘এ ন্যায্য আন্দোলন আমাদের অধিকার রক্ষার একমাত্র উপায়। আমরা বাধ্য হয়ে এই কর্মসূচি পালন করছি।’ বন্দরের কর্মকর্তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছেন। তবে শ্রমিকেরা মূল দাবিতে অনড় থাকায় বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা এখনও দেখা যায়নি।
কর্মবিরতি চলাকালে বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। বন্দরে কর্মরত অন্যান্য সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান চান, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সমাধান বের হয়নি।
অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, আগামী কয়েকদিনে যদি সরকারের সঙ্গে কোনো সমঝোতা না হয়, তাহলে কর্মবিরতি আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। এতে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও আন্তর্জাতিক আমদানিতে প্রভাব পড়বে। বন্দরের স্বার্থে আলোচনা এবং সমঝোতার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে।
এনসিটি তে চলমান শ্রমিক আন্দোলন বাংলাদেশের বন্দরের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ এক ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। শ্রমিকদের দাবি এবং প্রশাসনের পদক্ষেপ ভবিষ্যতে বন্দরের কার্যক্রমকে কতটা প্রভাবিত করবে, তা নজরকাড়া বিষয় হয়ে উঠেছে।