রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিয়ে সমালোচনা নয়, বরং জনগণের ভাগ্য বদলের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ও কার্যকর কর্মসূচির মাধ্যমেই দেশের প্রকৃত উপকার করা সম্ভব—এমন মন্তব্য করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, শুধু কথার রাজনীতি নয়, মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনাই বিএনপির মূল লক্ষ্য।
আজ সোমবার দুপুরে রাজধানীর কলাবাগান ক্রীড়াচক্রের মাঠে আয়োজিত ঢাকা–১০ আসনের নির্বাচনী জনসভায় এসব কথা বলেন তারেক রহমান। জনসভায় ঢাকা–১০ আসনে বিএনপির প্রার্থী রবিউল আলম রবি সভাপতিত্ব করেন। বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে জনসভাটি উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়।
তারেক রহমান বলেন, ‘আজকের এই নির্বাচনী জনসভায় আমরা চাইলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের নিয়ে অনেক সমালোচনা করতে পারতাম। কিন্তু শুধু সমালোচনা করলেই কি দেশের মানুষের কোনো লাভ হয়? না। দেশের মানুষের লাভ তখনই হয়, যখন একটি রাজনৈতিক দলের হাতে থাকে জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়নের সক্ষমতা।’ তিনি বলেন, বিএনপি সেই পরিকল্পনা নিয়েই জনগণের সামনে এসেছে।
বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন—যে বিশ্বাস শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ধারণ করতেন এবং যে বিশ্বাস দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ধারণ করেছেন—বাংলাদেশই আমাদের প্রথম এবং শেষ ঠিকানা। তিনি বলেন, সব অত্যাচার-নির্যাতনের মধ্যেও বেগম খালেদা জিয়া দেশ ছেড়ে যাননি। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, এই দেশের মানুষই তাঁর পরিবার। তারেক রহমান বলেন, ‘আসুন, আমরা সবাই মিলে পরিশ্রম করি, ঐক্যবদ্ধ থাকি এবং দেশকে গড়ে তুলি। কারণ সবার আগে—বাংলাদেশ।’
জনসভায় তারেক রহমান বিএনপির বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে বিএনপি সরকার গঠন করলে চালু করা হবে কৃষি কার্ড। একইভাবে দেশের মায়েদের, গৃহিণীদের এবং প্রান্তিক নারীদের সহায়তার জন্য চালু করা হবে ফ্যামিলি কার্ড। গ্রাম ও শহরের খেটে খাওয়া নারীদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শিক্ষা খাত প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, সারা দেশের স্কুলশিক্ষকদের পর্যায়ক্রমে কম্পিউটার প্রদান করা হবে, যাতে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়। একই সঙ্গে শহর ও গ্রাম—সব জায়গায় প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদান উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, প্রায় দেড় কোটির মতো প্রবাসী ভাই-বোনের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় দেশের অর্থনীতি সচল থাকে। অথচ তাঁদের অনেকেই দেশে ও বিদেশে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হন। এসব সমস্যা কমাতে, তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং দেশে ফিরে সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করতে বিএনপি সরকার গঠন করলে চালু করা হবে প্রবাসী কার্ড।
দেশের ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, মসজিদ ও মাদ্রাসার ইমাম, খতিব, মুয়াজ্জিনসহ বিভিন্ন ধর্মীয় গুরুদের অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করেন। বিএনপি সরকার গঠন করলে তাঁদের জন্য সম্মানজনক জীবনের নিশ্চয়তা দেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
বিএনপির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ‘আমাদের আরও অনেক পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সব পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য একটাই—বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন।’ তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দুর্ভিক্ষকবলিত বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছিলেন এবং খাদ্য রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করেছিলেন। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ শিল্পায়নের পথে এগিয়ে যায় এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বাংলাদেশকে ‘এমার্জিং টাইগার’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তিনি মেয়েদের জন্য দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বিনা মূল্যে শিক্ষা নিশ্চিত করেছিলেন। তারেক রহমান বলেন, এই ইতিহাসই প্রমাণ করে—বিএনপি অভিজ্ঞতার আলোকে দেশ পরিচালনা করতে সক্ষম।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ‘১২ তারিখ শুধু একটি ভোটের দিন নয়। এই নির্বাচন সেই ভোট, যার জন্য বাংলাদেশের মানুষ ১৬ বছর অপেক্ষা করেছে।’ তিনি ভোটারদের সচেতন থাকার আহ্বান জানান।
নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র ও অপচেষ্টার বিষয়ে সতর্ক করে তারেক রহমান বলেন, একটি পক্ষ নকল ব্যালটের সিল বানাতে গিয়ে ধরা পড়েছে। তাই ঢাকা–১০সহ সারা দেশের গণতন্ত্রপ্রত্যাশী মানুষকে সতর্ক থাকতে হবে। কেউ যদি বিকাশ নম্বর, এনআইডি নম্বর বা অন্য কোনো ব্যক্তিগত তথ্য চায়, তাহলে বুঝতে হবে সেখানে ষড়যন্ত্র রয়েছে। এসব অপচেষ্টা রুখে না দিলে শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ভোটাধিকার আবারও হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এর আগে রাজধানীর বনানী বাজারসংলগ্ন মাঠে আয়োজিত ঢাকা–১৭ আসনের নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন তারেক রহমান। সেখানে তিনি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, বিএনপির লক্ষ্য এমন একটি রাষ্ট্র গঠন করা, যেখানে সব নাগরিক দিন–রাত যেকোনো সময় নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবেন এবং পরিবার নিয়ে নিশ্চিন্তে বসবাস করতে পারবেন।
তারেক রহমান আজ নিজ নির্বাচনী এলাকা ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাতটি সংসদীয় আসনে মোট আটটি জনসভায় অংশ নেবেন। বনানী ও কলাবাগানের পর ঢাকা–৮ আসনে পীরজঙ্গী মাজার রোডে, ঢাকা–৯ আসনে মান্ডা তরুণ সংঘ মাঠে, ঢাকা–৫ আসনে যাত্রাবাড়ী শহীদ ফারুক রোডে জনসভায় বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা–৪ আসনে জুরাইন–দয়াগঞ্জ রোডে, ঢাকা–৬ আসনে ধূপখোলা মাঠে এবং ঢাকা–৭ আসনে লালবাগ বালুর মাঠে জনসভায় বক্তব্য দেবেন তিনি। এর আগে রোববার তিনি ঢাকা উত্তরের ছয়টি সংসদীয় আসনে জনসভায় অংশ নেন।
আকাশজমিন / আরআর