অবশেষে বহুল আলোচিত রেসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি) চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। হোয়াইট হাউজের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার হবে এবং পারস্পরিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। চুক্তিটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের একে অপরের বাজারে প্রবেশাধিকার সহজ করবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এই চুক্তি ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত মার্কিন-বাংলাদেশ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা ফোরাম চুক্তি (টিকফা)-এর ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করবে।
চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ মার্কিন শিল্প ও কৃষিপণ্যের জন্য উল্লেখযোগ্য অগ্রাধিকারমূলক বাজার প্রবেশাধিকার প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে রাসায়নিক, চিকিৎসা সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি ও মোটরযান, যন্ত্রাংশ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) সরঞ্জাম, জ্বালানি পণ্য, সয়া পণ্য, দুগ্ধজাত পণ্য, গরুর মাংস, হাঁস-মুরগি, বাদাম ও বিভিন্ন ধরনের ফল।
মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস (এক্সিম ব্যাংক) এবং ইউএস ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (ডিএফসি)-এর মাধ্যমে আইন অনুযায়ী মার্কিন বেসরকারি খাতের অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতায় বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ অর্থায়নে সহায়তা করার বিষয়টি বিবেচনা করবে যুক্তরাষ্ট্র।
চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিমান ক্রয় করতে হবে। পাশাপাশি ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য—যার মধ্যে গম, সয়া, তুলা ও ভুট্টা অন্তর্ভুক্ত—আমদানির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আগামী ১৫ বছরে আনুমানিক ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি পণ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্রয় করবে বাংলাদেশ।
উভয় দেশ নিজ নিজ অভ্যন্তরীণ পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি দ্রুত চূড়ান্ত করবে এবং চুক্তি কার্যকর করার আগে প্রয়োজনীয় দেশীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবে।
চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানিকৃত কিছু টেক্সটাইল ও পোশাক পণ্যের ক্ষেত্রে শূন্য পারস্পরিক শুল্ক সুবিধা দেওয়া হবে। এতে বাংলাদেশের পোশাক খাত বিশেষভাবে উপকৃত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শুল্কবিহীন বাধা দূর করতেও দুই দেশ একমত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মার্কিন ফেডারেল মোটরযান নিরাপত্তা ও নির্গমন মান অনুযায়ী নির্মিত যানবাহন গ্রহণ, মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের সার্টিফিকেট ও চিকিৎসা ডিভাইস এবং ওষুধের জন্য পূর্ব বিপণন অনুমোদন স্বীকৃতি দেওয়া, পাশাপাশি মার্কিন পুনর্নির্মিত পণ্য বা যন্ত্রাংশের ওপর যেকোনো আমদানি বিধিনিষেধ বা লাইসেন্সিং প্রয়োজনীয়তা অপসারণ।
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শ্রম অধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জোরপূর্বক বা বাধ্যতামূলক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন, শ্রমিকদের সংগঠনের স্বাধীনতা এবং যৌথ দরকষাকষির অধিকার সুরক্ষিত করতে শ্রম আইন সংশোধন ও প্রয়োগ জোরদার করা।
বিশ্বব্যাপী অন্যায্য বাণিজ্য অনুশীলন মোকাবিলায় সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিস্থাপকতা ও উদ্ভাবন বৃদ্ধির লক্ষ্যে অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা সমন্বয় জোরদার করতেও দুই দেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পাশাপাশি শুল্ক ফাঁকি রোধ, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা এবং নিজ নিজ অঞ্চলে বিনিয়োগ সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান করা হবে।
প্রসঙ্গত, সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) রাত ১০টার দিকে বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। নতুন চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক কমিয়ে ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত তুলা ও কৃত্রিম তন্তু দিয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে রেসিপ্রোকাল শূন্য শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
চুক্তি স্বাক্ষরের সময় বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ সহকারী লুৎফে সিদ্দিকী, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান।
আকাশজমিন / আরআর