অনলাইন রিপোর্টার
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে ২০২৫ সালের দুর্নীতির ধারণা সূচক (Corruption Perceptions Index- CPI) প্রকাশ করেছে। সূচকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অবস্থান ১৮২টি দেশের মধ্যে ১৩তম। বাংলাদেশের স্কোর দাঁড়িয়েছে ২৪, যা বৈশ্বিক গড় স্কোর ৪২-এর চেয়ে অনেক কম।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে দুর্নীতির মাত্রা সামান্য কমলেও সামগ্রিক র্যাঙ্কিংয়ে এক ধাপ পিছিয়েছে। স্কোর ২৪ হওয়ায় আমরা এখনও বৈশ্বিক মানের অনেক নিচে আছি। যদিও গত বছরের তুলনায় ১ পয়েন্টের উন্নতি হয়েছে, কিন্তু সংস্কারপ্রক্রিয়ার দুর্বলতা, মাঠপর্যায়ে দুর্নীতি এবং অন্যান্য সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে র্যাঙ্কিংয়ে অবনতি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার স্বচ্ছতার দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারেনি।
বাংলাদেশে এই স্কোর ২৪ থাকার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ইতিবাচক মূল্যায়ন উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের দুর্নীতি ও দুর্বল প্রশাসনিক মনিটরিং এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “আমরা একটি বড় সুযোগ হারিয়েছি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় র্যাঙ্কিংয়ে উন্নতি সীমিত হয়েছে।”
টিআইবি জানাচ্ছে, সিপিআই সূচকটি ১০০-এর স্কেলে নির্ধারণ করা হয়, যেখানে ০ স্কোরে দুর্নীতির ব্যাপকতা সর্বোচ্চ এবং ১০০ স্কোরে দুর্নীতির ব্যাপকতা সর্বনিম্ন। বাংলাদেশ এই স্কেলে ২৪ পেয়ে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় মধ্যম অবস্থানে রয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের অবস্থান হলো: ভুটান ৭১, ভারত ৩৯, মালদ্বীপ ৩৯, শ্রীলঙ্কা ৩৫, নেপাল ৩৪, পাকিস্তান ২৮ ও আফগানিস্তান ১৬। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, বাংলাদেশ আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের তুলনায় তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে, তবে ভুটান, ভারত ও মালদ্বীপের চেয়ে অনেক পিছিয়ে।
বিশ্বব্যাপী তালিকায় দুর্নীতিমুক্ত দেশ হিসেবে শীর্ষে আছে ডেনমার্ক (৮৯ স্কোর), এরপর ফিনল্যান্ড (৮৮) এবং সিঙ্গাপুর (৮৪)। অপরদিকে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে যৌথভাবে শীর্ষে অবস্থান করছে দক্ষিণ সুদান ও সোমালিয়া (৯ স্কোর), দ্বিতীয় অবস্থানে ভেনেজুয়েলা (১০ স্কোর) এবং যৌথভাবে তৃতীয় সর্বনিম্ন অবস্থানে আছে ইয়েমেন, লিবিয়া ও ইরিত্রিয়া (১৩ স্কোর)।
টিআইবি জানিয়েছে, সিপিআই সূচকের মাধ্যমে সরকার, প্রশাসন ও ব্যবসা খাতের স্বচ্ছতা ও দুর্নীতির মাত্রা পর্যবেক্ষণ করা হয়। এই সূচক আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের নীতি-প্রণয়ন, আইন প্রয়োগ ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশের অবস্থান পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় সামান্য উন্নত হলেও দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে দুর্নীতি রোধে আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট। ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকার, প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিকরা মিলিতভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। না হলে সামান্য স্কোর বৃদ্ধি সত্ত্বেও সামগ্রিক র্যাঙ্কিংয়ে দেশ পিছিয়ে যাবে।
টিআইবির এই রিপোর্টে বোঝা যায়, শুধু সূচকের স্কোর বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়; মাঠপর্যায়ের কার্যকর মনিটরিং, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং সামাজিক সচেতনতা অর্জন করতে হবে। সরকারের পদক্ষেপের পাশাপাশি নাগরিক অংশগ্রহণ ও গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৫ সালের সিপিআই রিপোর্ট বাংলাদেশে দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরলেও আন্তর্জাতিক তুলনায় দেশ এখনো অনেক পিছিয়ে। তবে সামান্য উন্নতি একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয় যে নির্দিষ্ট পদক্ষেপ ও নীতিমালার মাধ্যমে পরিস্থিতি আরও ভালো করা সম্ভব।
আকাশজমিন / আরআর