ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে নারীদের নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) জাতিসংঘের বাংলাদেশ কার্যালয় থেকে দেওয়া এক বার্তায় বলা হয়, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সবার সমান ও নিরাপদ অংশগ্রহণ একটি মৌলিক অধিকার, যা কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়।
বার্তায় জাতিসংঘ পুনর্ব্যক্ত করে যে, একটি গণতান্ত্রিক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পূর্বশর্ত হলো সকল নাগরিকের অবাধ ও নির্ভয়ে অংশগ্রহণ। এর মধ্যে নারী ও মেয়েদের অধিকার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী নারী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নারী, ভিন্ন লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষ এবং সমাজে যারা অধিকতর বাধা, বৈষম্য বা লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকেন, তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
জাতিসংঘ জানায়, নির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন নারী সংগঠন ও নাগরিক সমাজ নারী প্রার্থী ও ভোটারদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও হয়রানির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশেষ করে অনলাইন সহিংসতা ও ডিজিটাল হয়রানির বিষয়টি এখন ক্রমবর্ধমান হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নারীদের লক্ষ্য করে কটূক্তি, ভয়ভীতি, মানহানিকর প্রচার এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের ঘটনা নির্বাচনকেন্দ্রিক পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে।
বার্তায় বলা হয়, রাজনৈতিক নেতা, কর্মী, সাংবাদিক এবং মানবাধিকার রক্ষাকারীসহ জনজীবনে সক্রিয় নারীরা ক্রমবর্ধমানভাবে সাইবার বুলিং, ডিপফেক, পরিকল্পিত অনলাইন হয়রানি এবং ছবি বিকৃত করে অপব্যবহারের শিকার হচ্ছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পরিবর্তিত বা যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ড শুধু ব্যক্তিগত মর্যাদাকেই ক্ষুণ্ন করে না, বরং নারীদের জনজীবনে অংশগ্রহণে নিরুৎসাহিত করে।
জাতিসংঘের মতে, নির্বাচনের আগে, চলাকালীন ও পরবর্তী সময়ে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের দায়িত্ব। নারীরা যেন ভয়ভীতি, বৈষম্য, অনলাইন নির্যাতন বা প্রতিশোধের আশঙ্কা ছাড়াই প্রার্থী ও ভোটার হিসেবে অংশগ্রহণ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে নারীদের সক্রিয় ও অর্থবহ অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
বার্তায় আরও বলা হয়, জাতিসংঘ ধারাবাহিকভাবে নারীদের নেতৃত্ব ও প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর পক্ষে কাজ করে আসছে। নারীদের নির্বাচনি অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি করতে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা প্রদান অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন সক্ষমতা বৃদ্ধি কার্যক্রম, সচেতনতামূলক উদ্যোগ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে নারী প্রার্থী ও ভোটারদের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘ সব অংশীদার, বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতা, তাদের দল ও সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে—নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় নারীর প্রতি কোনো প্রকার হয়রানি, সহিংসতা বা ভয়ভীতি প্রদর্শন থেকে বিরত থাকতে হবে। নারী প্রার্থী ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল মানবাধিকারের প্রশ্ন নয়, বরং একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের অপরিহার্য শর্ত।
বার্তায় আরও বলা হয়, গণতন্ত্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সকল নাগরিক সমানভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ পান। নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই একটি নিরাপদ, সহিংসতামুক্ত ও সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করা সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।
জাতিসংঘ বিশ্বাস করে যে, কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং প্রতিটি ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য পদক্ষেপ অব্যাহত রাখবে। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় মানবাধিকারসম্মত পরিবেশ বজায় রাখতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে জাতিসংঘ সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বলেও জানানো হয়েছে।
সবশেষে জাতিসংঘ পুনরায় উল্লেখ করেছে, নারীসহ সকল নাগরিকের নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আরও বিশ্বাসযোগ্য ও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে।
আকাশজমিন / আরআর