অনলাইন রিপোর্টার
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে আগামী ১০০ দিনের ‘স্বল্পমেয়াদি’ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে নতুন সরকার। রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, অর্থনীতি পুনর্গঠন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ছয় মাসের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন—এই ছয়টি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সরকারের দায়িত্বশীলরা বলছেন, প্রথম একশ দিন মূলত ‘রাষ্ট্র মেরামতের’ ভিত্তি স্থাপনের সময়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, সুশাসন নিশ্চিতের লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা হবে প্রধান কাজ। দুর্নীতির সিন্ডিকেট ভেঙে প্রশাসনে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি মন্ত্রিসভার সদস্যদের আইনানুগভাবে কাজ করা এবং সরকারের ম্যানিফেস্টো বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
নতুন সরকার এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছে, যখন বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী দীর্ঘদিনের দুর্নীতি-দুঃশাসনে অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে ভঙ্গুর শাসন কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে স্বল্প সময়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবু সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বলছেন, বড় অবকাঠামো প্রকল্পের পরিবর্তে নীতিগত সংস্কার এবং জনজীবনে স্বস্তি ফেরানোই হবে প্রথম ১০০ দিনের মূল লক্ষ্য।
সরকার গঠনের পর প্রথম কর্মদিবসে সচিবালয়ে যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরে তাঁর সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে নিত্যপণ্যের দাম নাগালে রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং আগামী ১৮০ দিনের কর্মসূচি নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা হয়। মন্ত্রীরা জানান, ছয় মাসের একটি ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ প্রণয়ন করা হচ্ছে, যার প্রাথমিক ধাপ হবে প্রথম ১০০ দিনের কর্মতৎপরতা।
জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতি-দুঃশাসনে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি ও দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সরকার যাত্রা শুরু করেছে। আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের মনে শান্তি-নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি জোর দিয়ে বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় আইনের শাসনই হবে শেষ কথা; দলীয় বা রাজনৈতিক প্রভাব নয়।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। নির্বাচনী ইশতেহারে ‘ন্যায্য, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’ গড়ার অঙ্গীকার তুলে ধরা হয়। চার বছর আগে ঘোষিত রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা রূপরেখাও ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার মূলমন্ত্র ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।
সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে সুশাসন ও বিচার বিভাগীয় সংস্কার, সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখা, দুর্নীতি দমন এবং মানবাধিকার সুরক্ষা। একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, সিন্ডিকেট ভাঙতে কঠোর আইনি ব্যবস্থা এবং নিত্যপণ্যের সরবরাহ চেইন সচল রাখার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘হেলথ কার্ড’ ও কৃষি কার্ড চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। খেলাপি ঋণ আদায়ে টাস্কফোর্স গঠন এবং ব্যাংক খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে স্বাধীন কমিশন করার কথাও আলোচনায় আছে। শিক্ষিত বেকার যুবকদের জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদে বেকার ভাতা প্রদানের নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু করার বিষয়েও সরকার ভাবছে।
পররাষ্ট্রনীতিতে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সমমর্যাদা ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন, প্রবাসীদের জন্য ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চালু এবং বিদেশে কেউ মারা গেলে মরদেহ সরকারি খরচে দেশে আনার প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জরুরি পদক্ষেপ, শিক্ষকদের ডিজিটাল সরঞ্জামের আওতায় আনা এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের পরিকল্পনাও রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রথম ১০০ দিনের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হচ্ছে, পাশাপাশি ১৮০ দিনের কর্মসূচিও চূড়ান্ত করা হবে। পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ জানিয়েছেন, রোজায় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নই তাৎক্ষণিক লক্ষ্য।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সুশাসন ও আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধ্যাপক ড. মো. সাহাবুল হকের মতে, কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব হলেও জটিল কর্মসূচি স্বল্প সময়ে সম্পন্ন করা কঠিন। একইভাবে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়-এর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মো. শামীম মনে করেন, প্রথম ১০০ দিনে বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া গেলে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের ভিত্তি শক্ত হবে।
সব মিলিয়ে সরকারের প্রথম একশ দিনকে ভবিষ্যৎ পথচলার ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে দেখা হচ্ছে। নীতিগত সংস্কার, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং জনজীবনে স্বস্তি ফেরাতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ—এই তিনটি ক্ষেত্রেই জনগণের প্রত্যাশা সবচেয়ে বেশি। সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের ব্যবধান কমিয়ে আনা।
আকাশজমিন / আরআর