নতুন সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান নগদের ভবিষ্যৎ। দেশি ও বিদেশি একাধিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নগদে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে বিনিয়োগ প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপ নির্ভর করছে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর।
গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছেন, সরকার যদি নগদকে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে বিনিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হবে।
মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান। তিনি জানান, নগদে সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পরই কার্যক্রম এগোবে।
গভর্নরের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে ব্যারিস্টার আরমান বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নগদের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বর্তমান সরকার যদি প্রতিষ্ঠানটিকে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে বিনিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হবে।
নগদে বিদেশি বিনিয়োগ আনার বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই আলোচনা চলছিল। সেই ধারাবাহিকতায় একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হয়ে গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করেন ব্যারিস্টার আরমান। এর আগে বিনিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠিও দেন।
তিনি জানান, সংসদ সদস্য পরিচয়ের বাইরে তিনি একজন পেশাদার আইনজীবী হিসেবে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন। তার দাবি, তিনি ডেল, মাইক্রোসফট, অ্যাপল ও উবারের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন এবং এখন সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের আইনি সহায়তা দিচ্ছেন।
সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের ডিজিটাল ব্যাংকিং ও এমএফএস খাতে আগ্রহী বলে জানা গেছে। নগদে বিনিয়োগ লাভজনক হবে কি না তা নির্ধারণে একটি পূর্ণাঙ্গ অডিট করার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
সংসদ সদস্য হয়েও একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করা স্বার্থের সংঘাত কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ব্যারিস্টার আরমান বলেন, তিনি জনগণের সেবার জন্য রাজনীতি করেন এবং এখানে কোনো আর্থিক স্বার্থ নেই। পেশাগত জীবনে আইন চর্চা তার পরিবারের জীবিকা নির্বাহের অংশ। ঐতিহাসিকভাবে সংসদ সদস্যরা পেশাগত কাজ করে আসছেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও বলেন, দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সরকার এ বিষয়ে আন্তরিক বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
জানা যায়, ২০১৯ সালের ২৬ মার্চ যাত্রা শুরু করে নগদ। পরে প্রতিষ্ঠানটিকে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হয়। তবে বিগত সরকারের সময় নিয়ম ভেঙে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে এবং প্রতিষ্ঠানটি নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট নগদের আগের পর্ষদ ভেঙে প্রশাসক নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পরে উচ্চ আদালত সেই সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করলে নগদের দায়িত্ব নেয় ডাক অধিদপ্তর।
অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নগদের বিরুদ্ধে মামলা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। মামলায় সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ মিশুকসহ ২৪ জনকে আসামি করা হয়।
মামলার বিবরণে বলা হয়, ২০২৪ সালের ২১ থেকে ২৫ এপ্রিল পরিদর্শনে গিয়ে বিভিন্ন ব্যাংকের ট্রাস্ট কাম সেটেলমেন্ট হিসাবে ইস্যুকৃত ই-মানির বিপরীতে ১০১ কোটি টাকার বেশি রিয়েল মানির ঘাটতি এবং ৬৪৫ কোটি টাকার ই-মানি ঘাটতিসহ গুরুতর আর্থিক অনিয়মের তথ্য পাওয়া যায়।
তিনি আরও বলেন, নগদের জন্য বিকাশের মতো শক্তিশালী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, যারা ধাপে ধাপে শেয়ার কিনে বিনিয়োগ করবে। এতে নগদকে একটি যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হবে।
এর আগে গত বছরের ২৫ আগস্ট গভর্নর ঘোষণা দিয়েছিলেন, ডাক অধিদপ্তরের হাত থেকে নগদকে বেসরকারি খাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার এবং নতুন বিনিয়োগকারী খোঁজার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
বর্তমানে নতুন সরকারের নীতি নির্ধারণের অপেক্ষায় রয়েছে নগদের ভবিষ্যৎ। সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে নগদকে ব্যক্তিখাতে ছাড়ার পথ ও বিদেশি বিনিয়োগের বিষয়টি।
আকাশজমিন / আরআর