কবি মোহন রায়হানকে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫–এর জন্য মনোনীত হওয়ার পরেও পুরস্কার দেওয়া হয়নি এবং তা স্থগিত রাখা হয়েছে—এ নিয়ে শনিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে তিনি নিজেই ফেসবুক পোস্টে তথ্য জানান। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার সাধারণত বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য স্বীকৃতি হিসেবে প্রতি বছর প্রদান করা হয় এবং এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার হিসেবে বিবেচিত।
এদিন দুপুরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫ বিজয়ীদের হাতে তুলে দেন। পুরস্কারের তালিকা গত সোমবার বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়, যেখানে কবি মোহন রায়হানের নাম কবিতা বিভাগে থাকার কথা ছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবার পুরস্কার দেওয়ার সময় তার নাম তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়, যা নিয়ে ইতোমধ্যে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, রায়হানের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ উঠায় বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ পুরস্কারটি স্থগিত করেছে এবং অভিযোগ যাচাইয়ের পর প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। এই পরিস্থিতিতে রায়হানকে পুরস্কার না দেয়ার কারণে বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এখনও পাওয়া যায়নি।
রায়হানের বক্তব্য ও অনুভূতি
রায়হান নিজেই সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্টে জানিয়েছেন, তিনি তার পুরস্কারের জন্য কখনোই প্রচার করেননি বা কাউকে অনুরোধ করেননি; বাংলা একাডেমি পুরস্কার কমিটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাকে নির্বাচিত করেছিল। তিনি বলেন, পুরস্কারের আগে একদিন SSF (Special Security Force)‑এর মাধ্যমে পুরস্কার গ্রহণের মহড়ায় তাকে অংশ নেওয়ার জন্য ডাকা হয়েছিল, এবং অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে পদক গ্রহণের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু পুরস্কার বিতরণের দিন এসে তিনি জানতে পারেন যে তার পুরস্কার বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছে।
রায়হান অভিযোগ করেছেন যে তাঁর পুরস্কার বাতিলের পেছনে মূল কারণ হতে পারে তার ৪১ বছর আগে লেখিত একটি কবিতা ‘তাহেরের স্বপ্ন’—যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশিষ্ট এক ব্যক্তিত্ব কর্নেল আবু তাহারকে কেন্দ্র করে লেখা। তিনি দাবি করেন, এই কবিতার কারণে একটি মহল প্রধানমন্ত্রী বা কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করে এবং এর ফলে পুরস্কার বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে তিনি মনে করছেন।
তবে সরকারি কিংবা বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কবির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর প্রকৃতি বা বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রকাশ করা হয়নি; সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কোনো প্রতিনিধি বা বাংলা একাডেমির প্রকাশ্য বিবৃতিতে এসব তথ্য বিস্তারিত উল্লেখ করেননি। সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন যে অভিযোগগুলো যাচাই করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে সিদ্ধান্ত পুনরায় ঘোষণা করা হবে, তবে এই মুহূর্তে ব্যাখ্যা দেওয়া যাচ্ছে না।
বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার: ঐতিহ্য ও প্রক্রিয়া
বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার বাংলাদেশের সাহিত্যে অবদানের জন্য দীর্ঘদিন ধরে প্রদান করা হয়ে আসছে। এটি কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, গবেষণা, শিশু সাহিত্য, অনুবাদ, বৈজ্ঞানিক সাহিত্যসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে দেওয়া হয় এবং বাংলা একাডেমি সুসজ্জিত কমিটির সুপারিশ ও অনুমোদনের ভিত্তিতে বিজয়ীদের নাম চূড়ান্ত করা হয়।
প্রতিবছর ফেব্রুয়ারিতে, সাধারণত অমর একুশে বইমেলার উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রী বা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ নেতা বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করেন। ২০২৫ সালের পুরস্কারের তালিকায় মোট নয়টি ক্ষেত্রের জন্য লেখক ও গবেষকদের নাম ঘোষণা করা হয়েছিল, যার মধ্যে কবিতা বিভাগে মোহন রায়হানের নামও ছিল।
বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারটিকে সাধারণত সাহিত্যের অবদান ও প্রগতিশীল লেখালেখির স্বীকৃতি হিসেবে গণ্য করা হয় এবং বহু প্রখ্যাত সাহিত্যিক এটি অর্জন করেছেন। সেই ঐতিহ্য ও স্বীকৃতির কারণে পুরস্কারটি নিয়ে চলমান এই বিতর্ক literary circles এবং সাধারণ পাঠক‑সমাজের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
বিতর্ক ও প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া
পুরস্কার স্থগিত ও বাদ দেয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে সংস্কৃতি ও সাহিত্যিক মহলে বিভিন্ন মতামত প্রকাশিত হচ্ছে। অনেক সাহিত্যিক মনে করছেন, কোনো লেখকের পুরস্কার স্থগিত করার আগে অভিযোগের প্রকৃতি ও প্রমাণ সর্বজনীনভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন, যেন সামাজিক ও সাহিত্যিক সম্প্রদায়ের আস্থা বজায় থাকে। অন্যদিকে অনেকে বলছেন, যদি সত্যিই গুরুতর অভিযোগ থাকে তবে তা সময়মতো যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। তবে এই ধরণের বিতর্ক পুরস্কারের স্বতন্ত্রতা ও স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
রায়হান বর্তমানে জাতীয় কবিতা পরিষদের (National Poetry Council) সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং তার বিশিষ্ট সাহিত্যচর্চা ও সাহিত্যিক পরিচিতি রয়েছে। তাঁকে পুরস্কার না দেয়ার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও পাঠক ও সাহিত্যানুরাগীরা নানা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। অনেকে কবির প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন এবং পুরস্কার স্থগিতের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি তুলছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, অভিযোগ যাচাই না হওয়া পর্যন্ত পুরস্কার স্থগিত রাখা উচিত।
প্রভাব ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বর্তমানে বাংলা একাডেমি ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বলছে যে রায়হানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং তদন্তের পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আপাতত পুরস্কার স্থগিত রাখা হলেও সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে পুনরায় ঘোষণা করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন। এই প্রক্রিয়া শেষ হলে বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও ফলাফল জানাবে, যা সাহিত্যিক মহলে সঠিক পথ নির্দেশ করবে।
আকাশজমিন / আরআর