সোহাগ মাতুব্বর, ভাঙ্গা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি
সততার বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তা জুবায়ের। ভাঙ্গা হাইওয়ে থানার সামনে অবস্থিত তার ছোট্ট ইরানি তান্দুরী চায়ের দোকানে এক ক্রেতার ফেলে যাওয়া ব্যাগে থাকা ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭০ টাকা প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে তিনি প্রশংসা কুড়িয়েছেন।
ভাঙ্গা হাইওয়ে থানার সামনে ছোট্ট একটি ইরানি তান্দুরী চায়ের দোকান পরিচালনা করেন জুবায়ের। আকারে ছোট হলেও মানবিকতা ও সততার দিক থেকে দোকানটি স্থানীয়দের কাছে অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে। তরুণ এই উদ্যোক্তা তার কাজের মাধ্যমে বারবার প্রমাণ করেছেন—সততা এখনো সমাজে টিকে আছে।
জুবায়ের তান্দুরী চা-সহ প্রায় ৮০ ধরনের চা বিক্রি করেন। প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তার দোকানে ব্যস্ততা থাকে। শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এখানে চায়ের স্বাদ নিতে ও আড্ডা দিতে আসেন। তার হাসিমুখে আন্তরিক আচরণ এবং সেবা মানসিকতা স্থানীয়দের মধ্যে তাকে জনপ্রিয় করে তুলেছে।
কয়েকদিন আগে তার দোকানে এক ক্রেতা অসাবধানতাবশত একটি ব্যাগ রেখে যান। পরে ব্যাগটি খুলে দেখা যায়, সেখানে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭০ টাকা রয়েছে। এত বড় অঙ্কের টাকা পাওয়ার পর প্রলোভনে না পড়ে জুবায়ের সেটি নিজের কাছে না রেখে প্রকৃত মালিককে খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেন।
তিনি স্থানীয়ভাবে মাইকিং করান এবং পরিচিতদের মাধ্যমে খবর ছড়িয়ে দেন। পাশাপাশি প্রশাসনের সহায়তাও চান। বিষয়টি নিশ্চিত করতে তিনি স্থানীয় সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসেও যোগাযোগ করেন। জুবায়ের বলেন, “এই টাকা আমার নয়। যার টাকা, তাকে খুঁজে বের করাই আমার দায়িত্ব ও নৈতিক কর্তব্য।”
অবশেষে খোঁজ মেলে টাকার প্রকৃত মালিকের। তিনি ভাঙ্গা উপজেলার আলগী ইউনিয়নের বাসিন্দা মিরাজ শেখ (প্রায় ৭০)। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগে ভুগছেন। পরিবার সূত্রে জানা যায়, ঈদের পর তার হৃদরোগের অস্ত্রোপচারের জন্যই টাকাটি সঞ্চয় করে রাখা হয়েছিল। টাকা হারিয়ে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং শারীরিক অবস্থারও অবনতি ঘটে।
পরিচয় ও প্রয়োজনীয় প্রমাণ যাচাই-বাছাই শেষে এক আবেগঘন মুহূর্তে জুবায়ের পুরো টাকাই মিরাজ শেখের হাতে তুলে দেন। উপস্থিত স্থানীয়রা সেই দৃশ্য দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত মিরাজ শেখ বলেন, “আজও যে এমন সৎ মানুষ আছে, তা না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দিন।”
স্থানীয়রা জানান, জুবায়ের শুধু এই ঘটনায় নয়, নিয়মিতভাবেই মানবিক কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। জানা গেছে, তিনি তার মাসিক আয়ের প্রায় ৩০ শতাংশ অসহায় মানুষ, দরিদ্র শিক্ষার্থী ও রোগীদের সহায়তায় ব্যয় করেন। অনেক সময় গোপনে তিনি প্রয়োজনমতো মানুষের পাশে দাঁড়ান।
বর্তমান সময়ে যখন প্রতিনিয়ত দুর্নীতি, চুরি ও অনৈতিক ঘটনার খবর সামনে আসে, তখন জুবায়েরের এই উদ্যোগ সমাজে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে। তার সততা ও মানবিক আচরণ ভাঙ্গা উপজেলাসহ পুরো ফরিদপুর জেলায় প্রশংসিত হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন, এমন তরুণদের উদাহরণ সমাজে নৈতিক মূল্যবোধ ও মানবিক চেতনা জাগ্রত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।