ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
অঙ্গ পাচার চক্রের হাত থেকে ফিরল লোহাগাড়ার রায়হান ডিএমপির ৩ সহকারী পুলিশ কমিশনারকে নতুন পদে বদলি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তাপ: বিশ্ববাজারে তেলের দাম ছাড়াল ১০৭ ডলার হরমুজে নতুন নৌপথ: ওমানের আঞ্চলিক বৈঠক স্থগিত দেশে ফিরে ইতালিতে হামলার বিরুদ্ধে মুখ খুললেন অভিনেত্রী বাঁধন ব্রিকসে বিশ্বনেতাদের দেওয়া হলো নিরামিষ খাবার: বিজেপি-কংগ্রেস তুমুল বিতর্ক সারাদেশে ঘরে ঘরে জ্বর: ডেঙ্গু ও হামের সঙ্গে বাড়ছে টাইফয়েড ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ হলেই কি থামবে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান যুদ্ধ? ‘ট্রফি চোর’ অপবাদ মাথায় নিয়ে শান্ত মেজাজে মাঠ ছাড়লেন নাকভি ২৩ বছরের খরা কাটল না আমেরিকার, ইউএস ওপেনের ট্রফি জভেরেভের হাতে

কথোপকথন ফাঁস

জামিনের জন্য এক কোটি টাকা চান প্রসিকিউটর


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ১০ মার্চ, ২০২৬ সময় : ৪:২৮ পিএম

অনলাইন রিপোর্টার

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) জামিনের জন্য অর্থ দাবি সংক্রান্ত বিতর্ক নতুন করে সমালোচনার ঝড় তুলেছে। প্রথম আলো নেত্র নিউজের যৌথ অনুসন্ধানে প্রকাশিত হয়েছে, যে হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনের একাধিক অডিও রেকর্ডিংয়ে দেখা গেছে, আইসিটির একজন প্রসিকিউটর অর্থের বিনিময়ে জামিন দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন।

ঘটনার মূল চরিত্র হিসেবে উঠে এসেছেন চট্টগ্রাম- আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য বি এম ফজলে করিম চৌধুরী। ২০২৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তাঁকে জুলাই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। অভিযুক্ত সাবেক সংসদ সদস্যকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আসামি করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন।

প্রকাশিত রেকর্ডিং অনুসারে, আইসিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদার ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের সঙ্গে একাধিকবার হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করেছেন। রেকর্ডিংতে দেখা গেছে, তিনি পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছেন, অর্থের বিনিময়ে ফজলে করিম চৌধুরীকে জামিনে মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করা সম্ভব। সাইমুম রেজা তালুকদার হোয়াটসঅ্যাপে বলেছেন, তিনি ওয়ান ক্রোর টাকা চেয়েছিলেন এবং অর্থের ১০ লাখ টাকার অগ্রিম দেওয়ার কথাও তুলেছিলেন।

পরিবারের দাবি, সাবেক সংসদ সদস্যকে গ্রেপ্তারের প্রায় দুই মাস পর ২০২৫ সালের এপ্রিলে প্রসিকিউটর প্রথমবার তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি জানান, অর্থ প্রদান করলে ফজলে করিম চৌধুরীর জামিন এবং তদন্ত প্রতিবেদনের একটি অনুলিপি পাওয়াও সম্ভব। পরিবারের সদস্যরা কখনোও এই অর্থ দেননি। বরং তারা প্রসিকিউটরের সঙ্গে কথোপকথন চালিয়ে গিয়েছেন যাতে দুর্নীতির প্রমাণ সংগ্রহ করা যায়।

সাইমুম রেজা তালুকদার পেশায় একজন শিক্ষক। তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠ প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ হলেও আইসিটিতে নিয়োগের আগে তাঁর মামলা পরিচালনার অভিজ্ঞতা সীমিত ছিল।

ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষের দিকে তারা সাইমুম রেজার সঙ্গে কথোপকথন রেকর্ড করা শুরু করেন। মোট ২৬ বার তিনি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং অন্তত ১৪ বার সরাসরি ঘুষ চাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। প্রথম আলো নেত্র নিউজ রেকর্ডিং যাচাই করে দেখেছে।

পরিবারের সদস্যদের বরাত দিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে, সাইমুম রেজা তালুকদার বিভিন্ন সময় আইসিটির একজন তদন্ত কর্মকর্তাকে টাকা দেওয়ার পরামর্শও দিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেছেন, ওই কর্মকর্তা ফজলে করিম চৌধুরীর বিচারের দাবি করে আসা মুনিরিয়া নামের একটি ধর্মীয় সংগঠন থেকে ঘুষ নিয়েছেন। মুনিরিয়া তদন্ত কর্মকর্তার পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।

প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদার নিজে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘এটি সত্য নয়। এমনকি আমি যদি জামিন পাইয়ে দিতে চাইতামও, সেটা এককভাবে সম্ভব নয়। সবকিছু প্রধান প্রসিকিউটরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। আমার পদত্যাগের সঙ্গে কোনো দুর্নীতির সম্পর্ক নেই। আমি কয়েক দিন ধরে পদত্যাগ করার কথা ভাবছিলাম কারণ শিক্ষকতায় ফিরে যেতে চাইতাম।

ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের সদস্যরা জানান, ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনালে জরুরি চিকিৎসার জন্য লেখা আবেদন জমা দেওয়ার প্রায় ১০ মিনিট পর সাইমুম রেজা তালুকদার তাদের ফোন করেন। তিনি অর্থের প্রয়োজন নিয়ে ইঙ্গিত দেন, তবে ফোন কলটি রেকর্ড করা হয়নি। একই দিন সন্ধ্যায় একটি কথোপকথন রেকর্ড করা হয়। এতে তিনি আবারও টাকার বিষয়টি তোলেন। তিনি বলেন, “আলটিমেটলি যদি একটা ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে সব মিলিয়ে মানে ওনার ব্যাপারে একটা এক্সপেক্টেশন থাকবে। আমি ওয়ান ক্রোরের কথা বলেছিলাম। এটা কিস্তিতেও হতে পারে।

ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, পরবর্তী কথোপকথনে সাইমুম রেজা বলেন, এই ধরনের অর্থ চাইলে প্রসিকিউটরদের কানে খবর পৌঁছালে তার কাজের জায়গা বন্ধ হয়ে যাবে। তিনি আবারও ১০ লাখ টাকার অগ্রিমের কথা উল্লেখ করেন। এছাড়া বলেন, ‘কাজ হয়ে যাওয়ার পর বাকি টাকা দেওয়া ভালো হবে, আগে কিছু অগ্রিম দেওয়া যায়।

পরিবার সদস্যরা ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধান প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামকে এই বিষয় জানায়। প্রধান প্রসিকিউটর জানান, অভিযোগ প্রমাণিত না হলে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়। সাইমুম রেজা তালুকদারকে ওই মামলা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, যদিও তিনি আইসিটিতে অন্যান্য দায়িত্বে থেকে যান।

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সরকারের পরিবর্তনের পর ২৪ ফেব্রুয়ারি সাইমুম রেজা তালুকদার পুনরায় ফজলে করিম চৌধুরীর মামলায় দায়িত্ব নেন। তিনি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জামিনের পক্ষে তদবির করার প্রতিশ্রুতি দেন। একই সঙ্গে তিনি টাকার বিষয়টি পুনরায় তোলেন।

ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবার সাইমুম রেজার সঙ্গে কথোপকথনের সব বিষয় রেকর্ড করেছেন এবং তা নতুন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের কাছে পাঠানো হয়। পরিবারের দাবি, আইনমন্ত্রী তাঁকে গ্রেপ্তারের হুমকি দিয়েছেনযা সাইমুম রেজা তালুকদার অস্বীকার করেছেন।

বর্তমান চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, তিনি এই ঘটনার বিষয়ে অবগত নন। সাইমুম রেজা তালুকদারের পদত্যাগের কারণ শিক্ষকতায় ফিরে যাওয়া। গতকাল সোমবার সাইমুম রেজা তালুকদার আইসিটির প্রসিকিউটরের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন।

বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে জুলাই ২০২৪ সালে চট্টগ্রাম শহরে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনজন নিহত হওয়ার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। এখনও পর্যন্ত কোনো অভিযোগপত্র দাখিল হয়নি।

এই ঘটনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর নিয়োগ, দায়িত্ব দুর্নীতির বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে।



এ সম্পর্কিত আরো খবর