ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬,  ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
গাজীপুরে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ১০ কিমি যানজট শিক্ষা বোর্ডভিত্তিক এইচএসসি ফল: পাসের হারে বড় ব্যবধান হারুন অর রশীদকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করল সরকার বেতন-ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে আবারও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ বিরোধীদলের লং মার্চের কোনো যৌক্তিকতা নেই: রুহুল কবির রিজভী মিরপুর টেস্টে চার দিনেই বাংলাদেশের বড় হার, ওয়েস্ট ইন্ডিজের জয় ৮ উইকেটে সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তা তাহসিফ হত্যা: দীপ ৪ দিনের রিমান্ডে সৌদিতে আগুনে নিহত ৭ বাংলাদেশির লাশ দেশে পৌঁছেছে ময়মনসিংহ বোর্ডে পাসের হার ৫১.৪৪%, সামান্য কমলো সাফল্য ৩০ হাজার টাকা বেতনের দাবিতে মিরপুরে পোশাক শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ

বাবার মুখ না দেখেই জন্ম শুভজিতের, মায়ের স্বপ্ন নিরাপদ জীবন


  • আপলোড সময় : রবিবার ২৯ মার্চ, ২০২৬ সময় : ৯:২১ পিএম

খুলনার দাকোপ উপজেলার এক হৃদয়বিদারক বাস্তবতার গল্প এখন আলোচনায়। সাত বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর কোলজুড়ে এসেছে সন্তান, কিন্তু সেই আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার জন্য পাশে নেই বাবা সুব্রত মণ্ডল। গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর সুন্দরবনের করমজল খালে কাঁকড়া ধরে ফেরার পথে কুমিরের আক্রমণে প্রাণ হারান তিনি। স্বামীর মৃত্যুর ছয় মাস পর, গত ২০ মার্চ খুলনা ও মোংলার হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পুত্রসন্তানের জন্ম দেন তার স্ত্রী মুন্নী খাঁ (মুন)।

বর্তমানে দাকোপের পূর্ব ঢাংমারী এলাকায় নানি অপর্ণা পাটোয়ারীর বাড়িতে নবজাতককে নিয়ে দিন কাটছে মুনের। স্বামীর নামের সঙ্গে মিল রেখে সন্তানের নাম রাখা হয়েছে শুভজিৎ। নবজাতক সুস্থ থাকলেও মুনের চোখে এখন ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা। একদিকে প্রায় এক লাখ টাকার ঋণ, অন্যদিকে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা তাকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

মুঠোফোনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মুন জানান, গত দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর দিন ঘরে চরম অর্থকষ্ট ছিল। অসুস্থ স্ত্রীকে রেখে বাধ্য হয়েই সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরতে গিয়েছিলেন সুব্রত। ফেরার পথে বাড়ির মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে করমজল খাল সাঁতরে পার হওয়ার সময় কুমিরের আক্রমণের শিকার হন তিনি। প্রায় সাত ঘণ্টা পর তার নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। তখন মুন ছিলেন চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা।

সুন্দরবন সংলগ্ন জনপদে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষ বাঘ ও কুমিরের ঝুঁকি নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। সুব্রতের বাবা কুমুদ মণ্ডলও আজীবন বনজীবী হিসেবে কাজ করেছেন। সুব্রতের অন্য দুই ভাইও বর্তমানে বনের ওপর নির্ভরশীল। তবে এই ঝুঁকিপূর্ণ পেশা থেকে সন্তানকে দূরে রাখতে চান মুন।

তিনি বলেন, “আমার পুরো জীবনটাই কষ্টের। নানি চায়ের দোকান চালিয়ে আমাকে বড় করেছেন। আমি চাই না আমার সন্তান এই বিপদসংকুল বাদাবনে যাক। সে লেখাপড়া শিখুক, মানুষের মতো মানুষ হোক।”

সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক সাংবাদিক শুভ্র শচীন বলেন, বাঘ বা কুমিরের আক্রমণে যারা প্রাণ হারান, তাদের পরিবারের সদস্যরা বিশেষ করে স্ত্রীরা সামাজিকভাবে নানা কুসংস্কার ও অবহেলার শিকার হন। অনেক সময় তাদের ‘অপয়া’ বা ‘অলক্ষ্মী’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন, নদীতে মাছের সংকট এবং বনদস্যু ও বন্যপ্রাণীর ঝুঁকি বনজীবীদের জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, সুব্রত মণ্ডল বৈধ পাস পারমিট নিয়ে বনে গিয়েছিলেন। তাই সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তার পরিবারকে ৩ লাখ টাকার সহায়তার চেক প্রদান করা হয়েছে। তবে যারা অনুমতি ছাড়া বনে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন, তারা এই সুবিধা পান না।

সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ জলভাগ ও অসংখ্য খালের মাঝে প্রতিনিয়ত লুকিয়ে থাকে মৃত্যুর ঝুঁকি। এই বাস্তবতার মধ্যেই বড় হয়ে উঠবে শুভজিৎ। সে কি পারবে একটি নিরাপদ ও শিক্ষিত জীবনের পথে এগিয়ে যেতে—এই প্রশ্নই এখন দাকোপের উপকূলীয় মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর