অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে কোনগুলো বহাল থাকবে আর কোনগুলো বাতিল বা স্থগিত হবে—এ নিয়ে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি তাদের সুপারিশ চূড়ান্ত করেছে। কমিটির প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০টি অধ্যাদেশ বর্তমান অধিবেশনে অনুমোদন করা হচ্ছে না। এর মধ্যে চারটি অধ্যাদেশ সরাসরি বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে এবং বাকি ১৬টি পরবর্তী সময়ে আরও যাচাই–বাছাই করে শক্তিশালী আকারে নতুন করে বিল হিসেবে আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বিশেষ কমিটির প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদিন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু বিল আকারে পাসের জন্য উত্থাপন করার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে সংসদে উপস্থাপন করা হবে।
সংবিধান অনুযায়ী, কোনো অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপনের ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদন না পেলে তা কার্যকারিতা হারায়। ফলে যেসব ২০টি অধ্যাদেশ অনুমোদন পাচ্ছে না, সেগুলো নির্ধারিত সময় শেষে বাতিল হয়ে যাবে।
এই ২০টি অধ্যাদেশের বিষয়ে বিশেষ কমিটির ভেতরেও মতবিরোধ রয়েছে। বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর তিন সদস্য এসব বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছেন।
সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এতে ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’ গঠনের কথা বলা হয়েছিল, যা বিচারপতি নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তিদের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করবে।
অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিচার বিভাগের জন্য একটি স্বতন্ত্র প্রশাসনিক কাঠামো তৈরির পরিকল্পনা ছিল। এই সচিবালয় অধস্তন আদালত ও প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের তত্ত্বাবধান, নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করত। বিচারকদের পদায়ন, বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিষয়ও এর অধীনে থাকত।
এই দুটি অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশের ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা ভিন্নমত দিয়েছেন।
রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশের মাধ্যমে রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আহরণ কার্যক্রম আলাদা করার প্রস্তাব ছিল। এতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে দুটি পৃথক বিভাগ গঠনের কথা বলা হয়। এই অধ্যাদেশকে ঘিরে সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়।
মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশের মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণভিত্তিক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। তবে এটি এখনো কার্যকর হয়নি।
এই ১৬টি অধ্যাদেশের বেশ কয়েকটির ক্ষেত্রেই জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা ভিন্নমত দিয়েছেন।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক (সংশোধন), বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (সংশোধন), বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (সংশোধন), সাইবার সুরক্ষা, সরকারি চাকরি (সংশোধন), আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সংশোধনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ রয়েছে।
এই তালিকায় বেশ কিছু আইন রয়েছে, যেগুলো নাম পরিবর্তন সংক্রান্ত। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে উল্লিখিত কিছু নাম পরিবর্তনের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশটি বিশেষভাবে আলোচিত। এতে নির্দিষ্ট কোনো সত্তার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করা হয়েছিল। মিছিল–মিটিং, প্রকাশনা ও অন্যান্য কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশের মাধ্যমে একটি স্বাধীন কমিশন গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, যা পুলিশের মহাপরিদর্শক নিয়োগে সুপারিশ করবে এবং নাগরিক অভিযোগ তদন্ত করবে। এটিও সংশোধিত আকারে পাসের সুপারিশ করা হয়েছে, যদিও এতে জামায়াতের আপত্তি রয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, বিশেষ কমিটির সুপারিশে স্পষ্ট হয়েছে যে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা সব অধ্যাদেশ একইভাবে গ্রহণ করা হচ্ছে না। কিছু অধ্যাদেশ তাৎক্ষণিকভাবে পাস করা হচ্ছে, কিছু সংশোধনের মাধ্যমে পাস করা হবে এবং কিছু বাতিল বা স্থগিত রাখা হচ্ছে।
এই প্রক্রিয়া দেশের আইন প্রণয়ন ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যেখানে প্রতিটি অধ্যাদেশের কার্যকারিতা, প্রয়োজনীয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
আকাশজমিন / আরআর