দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা চুয়াডাঙ্গার ওপর দিয়ে টানা দুদিন ধরে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। তাপমাত্রা প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছায় জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। তীব্র রোদ আর অসহনীয় গরমে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। বিশেষ করে খেটে-খাওয়া শ্রমজীবী মানুষরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন।
শুক্রবার (৩ এপ্রিল) বেলা ৩টায় চুয়াডাঙ্গায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৯.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৩১ শতাংশ। এর আগের দিন বৃহস্পতিবার একই সময়ে তাপমাত্রা ছিল ৩৮.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা সেদিন দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা হিসেবে রেকর্ড করা হয়। টানা তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে জেলার পরিবেশে এক ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
হঠাৎ তাপমাত্রার এমন ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হতে চাইছেন না। দুপুরের দিকে রাস্তাঘাট অনেকটাই ফাঁকা হয়ে পড়ছে। তবে জীবিকার তাগিদে অনেকেই বাধ্য হয়ে রোদে কাজ করতে নামছেন। তীব্র গরমে শ্রমিক, দিনমজুর, রিকশাচালক ও কৃষকরা কাজ করতে গিয়ে শারীরিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন। অনেকেই মাথা ঘোরা, দুর্বলতা ও পানিশূন্যতার মতো সমস্যায় ভুগছেন।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় তাপমাত্রার প্রভাবে সড়কের পিচ গলে যাওয়ার ঘটনাও দেখা গেছে। বিশেষ করে শহরের পৌরসভা-সংলগ্ন এলাকায় এমন দৃশ্য চোখে পড়েছে। রোদের তাপে রাস্তার উপরিভাগ নরম হয়ে গিয়ে যানবাহন চলাচলেও কিছুটা সমস্যা সৃষ্টি করছে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
তীব্র গরমে পথচারী, শিক্ষার্থী ও দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের কেউ কেউ শরবত ও স্যালাইন পান করাতে এগিয়ে আসছেন। এতে কিছুটা স্বস্তি পেলেও গরমের তীব্রতা কমছে না। স্থানীয়ভাবে স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগে এ ধরনের কার্যক্রম চালানো হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত।
চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার দিনমজুর আব্দুল করিম বলেন, রোদে কাজ করা একেবারে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। একটু পরপর মাথা ঘোরে। তবুও কাজ না করলে সংসার চালানো যাবে না, তাই বাধ্য হয়েই কাজ করতে হচ্ছে। তার মতো আরও অনেক শ্রমজীবী মানুষ একই পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন।
আরেক দিনমজুর সোহেল রানা জানান, গরমে শরীর একেবারে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে কাজ বন্ধ করে ছায়ায় বসে থাকতে হয়। এতে আয় কমে যায়, যা তাদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। তিনি বলেন, প্রতিদিনের আয় দিয়ে সংসার চালাতে হয়, তাই কাজ বন্ধ রাখা সম্ভব নয়।
ভ্যানচালক শহিদুল ইসলাম বলেন, দুপুরের দিকে রাস্তায় বের হওয়া খুবই কষ্টকর। গরমে যাত্রীও কম থাকে, আবার শরীরও সাপোর্ট করে না। এতে আয়ও কমে যাচ্ছে। ফলে একদিকে শারীরিক কষ্ট, অন্যদিকে অর্থনৈতিক চাপ—দুই দিক থেকেই ভোগান্তি বাড়ছে।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রাশেদ মাহমুদ বলেন, অফিসে যাতায়াত করতে খুব কষ্ট হচ্ছে। রাস্তায় বের হলেই মনে হয় শরীর পুড়ে যাচ্ছে। এই গরমে স্বাভাবিকভাবে কাজ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি এমন যে দিনের বেলা বাইরে বের হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে।
এদিকে তীব্র গরমের মধ্যে জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। জেলার বিভিন্ন তেলের পাম্পে মোটরসাইকেল চালকদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। প্রচণ্ড রোদের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে তাদের। এতে শারীরিক কষ্ট আরও বেড়ে যাচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গা শহরের মোটরসাইকেল চালক আকাশ ইসলাম বলেন, সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে তেল নিতে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা সময় লাগছে। এই গরমে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকা অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়েছে। তিনি জানান, প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় তেল নিতে গিয়ে ভোগান্তির কারণে পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে হচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গা প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জামিনুর রহমান জানান, জেলায় বর্তমানে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি আগামী এক থেকে দুই দিন অব্যাহত থাকতে পারে। এরপর তাপমাত্রা কিছুটা কমার সম্ভাবনা রয়েছে এবং বৃষ্টিরও আভাস রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, তাপপ্রবাহের সময় সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের অতিরিক্ত যত্ন নিতে হবে। দিনের বেলা অপ্রয়োজনে বাইরে না বের হওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং হালকা খাবার গ্রহণের পরামর্শ দেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপপ্রবাহের সময় শরীরের পানিশূন্যতা ও হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই নিয়মিত পানি, স্যালাইন বা অন্যান্য তরল খাবার গ্রহণ করা জরুরি। পাশাপাশি সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলা এবং প্রয়োজনে ছাতা বা টুপি ব্যবহার করা উচিত।
সব মিলিয়ে চুয়াডাঙ্গার বর্তমান পরিস্থিতি জনজীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। তাপমাত্রা আরও বাড়লে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, কয়েক দিনের মধ্যে বৃষ্টি হলে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসতে পারে।
আকাশজমিন / আরআর