অনলাইন রিপোর্টার
রাজধানীর ব্যস্ত নগরী যখন গভীর রাতে ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন বিজয় সরণি এলাকার একটি তেলের পাম্পে দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্য। মাঝরাত পেরিয়ে ভোর পর্যন্ত সেখানে শত শত মানুষ জ্বালানি তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেছেন। যানবাহনের দীর্ঘ সারি আর ক্লান্ত মানুষের মুখ যেন বর্তমান জ্বালানি সংকটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে।
শনিবার দিবাগত রাত ২টার দিকে রাজধানীর বিজয় সরণি এলাকার ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের সামনে দেখা যায় দীর্ঘ যানবাহনের লাইন। উত্তরের মহাখালী থেকে দক্ষিণ দিকে তেজগাঁও পর্যন্ত প্রায় কয়েক কিলোমিটারজুড়ে মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি ও পণ্যবাহী ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে তেলের অপেক্ষায়। হেডলাইটের আলোয় আলোকিত সেই দীর্ঘ সারি এবং অপেক্ষমাণ মানুষের ক্লান্ত মুখগুলো যেন এক অস্থির সময়ের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।
রায়েরবাগ থেকে আসা মোটরসাইকেলচালক কামরুল হাসান তেলের আশায় প্রায় ১৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে এখানে এসেছেন। রাত ৯টার দিকে তিনি লাইনে দাঁড়ান। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ভোরের দিকে তিনি মাত্র ৬০০ টাকার তেল পান। ঘড়িতে তখন প্রায় সোয়া ৪টা। প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টা অপেক্ষার পর তেল হাতে পেলেও তাঁর মুখে ছিল হতাশার ছাপ।
কামরুল হাসান জানান, তিনি তেজগাঁওয়ের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন এবং প্রতিদিন রায়েরবাগ থেকে মোটরসাইকেলে যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু তেলের সংকটে পাম্পগুলো চাহিদার তুলনায় কম তেল দিচ্ছে। তিনি বলেন, এত অল্প তেলে বড়জোর দুই থেকে তিন দিন চলা যায়। সপ্তাহে কয়েক দিন যদি এভাবে সাত-আট ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, তাহলে জীবনটাই যেন থেমে যাবে।
ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ লাইনে গুনে দেখা যায় ৪৮৩টি মোটরসাইকেল, ৩৬৯টি ব্যক্তিগত গাড়ি এবং ৩১টি পণ্যবাহী ট্রাক তেলের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘ অপেক্ষায় ক্লান্ত অনেক চালক মোটরসাইকেলের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছেন। কেউ আবার সময় কাটাতে পাশের চালকদের সঙ্গে মোবাইলে লুডু খেলছেন। অনেকেই সড়কের মাঝের বিভাজকে বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন।
পাম্পের সহকারী সেলস সুপারভাইজার মাসুদ কবির জানান, আগের তুলনায় তেলের সরবরাহ অনেক কমে গেছে। আগে প্রতিদিন প্রায় ৫০ থেকে ৫২ হাজার লিটার জ্বালানি সরবরাহ পাওয়া যেত। এখন তা কমে ৩৭ থেকে ৪০ হাজার লিটারে নেমে এসেছে। তিনি বলেন, যান্ত্রিক কারণে রিজার্ভারে সব সময় দেড় থেকে দুই হাজার লিটার তেল সংরক্ষণ করে রাখতে হয়। কিন্তু মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হওয়ায় অনেকে ট্যাঙ্ক অর্ধেক ভর্তি থাকলেও লাইনে এসে দাঁড়াচ্ছেন।
পাম্পের কর্মীদের মতে, মানুষের মধ্যে ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে জ্বালানি কেনার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। কেউ জরুরি কাজে গ্রামে যেতে চান, কেউ আবার পণ্য পরিবহন নিয়ে উদ্বিগ্ন। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে পাম্প কর্তৃপক্ষ মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি এবং ট্রাকের জন্য আলাদা তিনটি লাইন করেছে। তবুও ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের চাহিদা মেটাতে সেখানে গড়ে উঠেছে ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান। ঝালমুড়ি, শিঙারা, সমুচা, রুটি-সবজি কিংবা চা-সিগারেট—সবকিছুরই ছোট ছোট দোকান দেখা গেছে। অনেক চালক ক্ষুধা মেটাতে এসব দোকানের ওপর নির্ভর করছেন।
এদিকে আসাদগেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশনেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গেছে। ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার থেকে আসা উবারচালক শাহীন খান জানান, তিনি আগে অন্য একটি পাম্পে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করেছিলেন। সেখানে তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় বিজয় সরণিতে আসতে হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, কিছু পাম্প মালিক সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন।
চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য রাখতে পাম্পগুলো তেল বিক্রিতে সীমা নির্ধারণ করেছে। ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য সর্বোচ্চ ২ হাজার ৪০০ টাকার তেল এবং মোটরসাইকেলের জন্য ৬০০ টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে। বড় পণ্যবাহী ট্রাকগুলো সর্বোচ্চ ১০০ লিটার তেল পাচ্ছে।
রাত পেরিয়ে সকাল হলেও লাইনের দৈর্ঘ্য খুব একটা কমেনি। নতুন নতুন ক্রেতা এসে লাইনে যুক্ত হচ্ছেন। পরিবহন শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ দ্রুত তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের আশা, দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং এই দীর্ঘ অপেক্ষা থেকে মুক্তি মিলবে।
আকাশজমিন / আরআর