ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সরলো বঙ্গবন্ধুর একক ছবি, যুক্ত হলো জিন্নাহ ও জুলাই অভ্যুত্থান মমেকের ৩য় তলায় শিশু ওয়ার্ডে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিস শিল্পে গ্যাস সরবরাহ মঙ্গলবার থেকেই স্বাভাবিক হওয়ার আশা প্রধানমন্ত্রীর ব্যাংকে কোটি টাকার হিসাব ছাড়াল ১ লাখ ৪১ হাজার কাশফুল শুধু সৌন্দর্য নয়, অনেকের জীবিকাও বটে তাড়াশে গোয়ালঘরের তালা ভেঙে ৮টি গরু চুরি, নিঃস্ব কৃষক পরিবার ডেঙ্গুতে আরও ৮ জনের মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ১৭৩৩ জন ঢাকার দুই সিটিতে জামায়াতের অনানুষ্ঠানিক মেয়র প্রার্থী ঘোষণা চারবার গুলিবিদ্ধ ও তিনবার কারাবরণ: ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের আলোচনায় ইশরাক অঙ্গ পাচার চক্রের হাত থেকে ফিরল লোহাগাড়ার রায়হান

সাতক্ষীরায় হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে, উদ্বেগে অভিভাবকরা


  • আপলোড সময় : রবিবার ০৫ এপ্রিল, ২০২৬ সময় : ৯:০১ পিএম

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি 

সাতক্ষীরায় শিশুদের মধ্যে আশঙ্কাজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হাম। প্রতিদিন নতুন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় জেলার অভিভাবকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি, অপুষ্টি এবং সচেতনতার অভাব—এই তিনটি কারণই বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

শনিবার (৪ এপ্রিল) একদিনেই জেলায় ১৩ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যা ওই দিন খুলনা বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই জেলায় হামের সংক্রমণ ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছিল, তবে সাম্প্রতিক সময়ে তা উদ্বেগজনক মাত্রা ধারণ করেছে।

সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে জেলায় ২৯ জন শিশু বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। ইতোমধ্যে ৪০ জন শিশুর নমুনা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে একজনের শরীরে হাম এবং অপর একজনের শরীরে রুবেলা শনাক্ত হয়েছে। বাকি নমুনাগুলোর রিপোর্ট এখনো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ ঘুরে দেখা যায়, শিশু ও তাদের অভিভাবকদের ভিড়ে হাসপাতালের পরিবেশ অনেকটাই চাপের মধ্যে রয়েছে। চিকিৎসকদের ব্যস্ততা বেড়ে গেছে, পাশাপাশি হাসপাতালের শয্যা সংকটও প্রকট হয়ে উঠছে।

পৌর এলাকার অভিভাবক উম্মে সালমা জানান, তার অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া মেয়ের প্রথমে জ্বর ও শরীর ব্যথা শুরু হয়। এরপর কয়েকদিনের মধ্যে শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। তিনি প্রথমে সাধারণ জ্বর মনে করলেও পরে অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কোমরপুর গ্রামের বাসিন্দা সোহরাব হোসেন। তিনি বলেন, তার মেয়েও অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। জ্বর ও শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়ার পর তাকে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে জানা যায়, সে ফাউলপক্সে আক্রান্ত হয়েছে। বর্তমানে সে বাড়িতে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

অন্যদিকে আশাশুনির সুব্রত জানান, তার ছেলের অবস্থার অবনতি হলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে হাম শনাক্ত করেন। বর্তমানে চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে তার সন্তানের অবস্থার উন্নতি হয়েছে।

জেলা শিক্ষা অফিসার রুহুল আমিন জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত কোনো শিক্ষার্থীর মধ্যে বড় ধরনের সংক্রমণের খবর পাওয়া যায়নি। তবে অনেক শিক্ষার্থীর পরিবারের ছোট সদস্যদের মধ্যে জ্বর ও ফুসকুড়ির উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আলমগীর কবীর জানান, জেলার বিভিন্ন এলাকায় জলবসন্তের প্রকোপও দেখা যাচ্ছে। আক্রান্ত শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগে থেকেই সতর্ক করা হয়েছে। প্রতিদিনের সমাবেশে স্বাস্থ্য সচেতনতা বিষয়ে জোর দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সপ্তাহে অন্তত দুইদিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সাতক্ষীরা সরকারি শিশু হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মো. শামছুর রহমান বলেন, “হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। সাধারণত তীব্র জ্বর, কাশি, সর্দি এবং চোখ লাল হয়ে যাওয়া এর প্রাথমিক লক্ষণ। কয়েকদিন পর শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া বা ডায়রিয়ার মতো জটিলতা তৈরি হতে পারে, যা শিশুদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।”

তিনি আরও বলেন, অনেক শিশু নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে অথবা নির্ধারিত সময়ের দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণ করছে না। ফলে তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হচ্ছে না। এছাড়া অপুষ্টি ও ভিটামিন ‘এ’-এর অভাবও সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

সদর হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. রিয়াদ হাসান জানান, আক্রান্ত শিশুদের উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি তাদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল দেওয়া হচ্ছে, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে। জটিল রোগীদের জন্য আইসোলেশন ও বিশেষ ওয়ার্ডের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

জেলা সিভিল সার্জন ডা. আব্দুস সালাম জানান, জেলায় চিকিৎসক সংকট একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। ৩২৬ জন চিকিৎসকের পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১২৫ জন। এই সীমিত জনবল নিয়েই স্বাস্থ্যকর্মীরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সম্ভাব্য রোগী শনাক্ত করছেন এবং অভিভাবকদের সচেতন করার চেষ্টা করছেন। তবে জনবল স্বল্পতার কারণে এই কার্যক্রম আরও বিস্তৃতভাবে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

জেলা মেডিকেল অফিসার (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা. জয়ন্ত সরকার জানান, শিশুদের জন্য ৯ মাস এবং ১৫ মাস বয়সে দুই ডোজ টিকা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই টিকা গ্রহণ না করলে শিশুরা সহজেই হামসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

সচেতন নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে দাবি উঠেছে, দ্রুত প্রান্তিক পর্যায়ে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। উঠান বৈঠক, গণসচেতনতা কার্যক্রম এবং প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে অভিভাবকদের সচেতন না করা গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

চিকিৎসকরা অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে পরামর্শ দিয়েছেন, কোনো গুজবে কান না দিয়ে শিশুদের জ্বর বা ফুসকুড়ির লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা নিলে জটিলতা এড়ানো সম্ভব।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সাতক্ষীরায় স্বাস্থ্যখাতের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশাবাদী, সময়মতো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

আকাশজমিন / আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর