জাতীয় সংসদে আবারও মাইক–বিভ্রাটের ঘটনা ঘটেছে। এ কারণে রোববার (৫ এপ্রিল) বিকেলে সংসদের অধিবেশন বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। তিনি এই পরিস্থিতিকে “জাতির জন্য কলঙ্কজনক” বলে মন্তব্য করেছেন।
সংসদ সূত্রে জানা গেছে, মাগরিবের নামাজের আগে সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম বক্তব্য দেওয়ার সময় হঠাৎ মাইকে বিভ্রাট দেখা দেয়। এতে তাঁর বক্তব্য স্পষ্টভাবে শোনা যাচ্ছিল না।
এদিন অধিবেশনে চারটি বিল পাস হওয়ার পর চিফ হুইপ বক্তব্য দিতে ওঠেন। সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা বাড়িয়ে ৩২ বছর নির্ধারণ করে অন্তর্বতী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ অনুমোদন বিলে বিরোধী দল ‘হ্যাঁ’ ভোট না দেওয়ায় তিনি সমালোচনা করেন। এ সময় বিরোধী দল প্রতিবাদ জানালেও তিনি বক্তব্য চালিয়ে যান।
তিনি বলেন, চাকরির জন্য জুলাই অভ্যুত্থান হয়েছে, কিন্তু বিরোধী দল বয়স বৃদ্ধির বিলে সমর্থন না দেওয়ায় তিনি বিস্মিত। এ বক্তব্যকে সমর্থন জানায় সরকারদলীয় সদস্যরা। ফলে সংসদে হট্টগোলের সৃষ্টি হয় এবং পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ চিফ হুইপকে উদ্দেশ করে বলেন, তাঁর বক্তব্য শোনা যাচ্ছে না, তাই বসে পড়তে। কিন্তু সংসদ সদস্যরা সমস্বরে জানান, তাঁরা স্পিকারের কথাও শুনতে পাচ্ছেন না। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্পিকার বলেন, “তাহলে মুলতবি করে দেই।” পরে তিনি মাইক–বিভ্রাটের কারণে ২০ মিনিট এবং মাগরিবের নামাজের বিরতির জন্য আরও ২০ মিনিটসহ মোট ৪০ মিনিটের জন্য অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন। তবে বাস্তবে প্রায় এক ঘণ্টা ১৮ মিনিট পর আবার অধিবেশন শুরু হয়।
এটি প্রথম নয়। এর আগে গত ১২ মার্চ সংসদের প্রথম দিনেও একই ধরনের মাইক–বিভ্রাট দেখা যায়। সেদিন প্রায় ৪০ মিনিট অধিবেশন বন্ধ ছিল। ধারাবাহিকভাবে এমন সমস্যা দেখা দেওয়ায় সংসদ সদস্যদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
মাগরিবের বিরতির পর অধিবেশন শুরু হলে স্পিকার মাইক–বিভ্রাটের কারণ ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, দুটি কারণে এই সমস্যা হচ্ছে। প্রথমত, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় বিক্ষুব্ধ জনতা সংসদের আসবাবপত্র ও সাউন্ড সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত করে। দ্বিতীয়ত, সংসদের মাইক সিস্টেম স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ওয়ারেন্টি বা কাগজপত্র পাওয়া যাচ্ছে না।
স্পিকার আরও বলেন, বিষয়টি থেকে বোঝা যায়, অত্যন্ত হেলাফেলার সঙ্গে এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সম্পন্ন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা মেরামতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। স্থানীয়ভাবে যারা এ কাজে জড়িত ছিল, তারাও দায় এড়িয়ে যাচ্ছে।
তিনি জানান, এ বিষয়ে সংসদের সচিবকে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা যায়। তিনি বলেন, “রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ এই হাউস, জাতীয় সংসদে এভাবে বারবার বিদ্যুৎ–বিভ্রাট ঘটছে—এটা আমাদের জাতির জন্য, রাষ্ট্রের জন্য কলঙ্কজনক।”
উল্লেখ্য, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতা সংসদ ভবনে প্রবেশ করে এবং বিভিন্ন কক্ষের আসবাবপত্র ও সাউন্ড সিস্টেম ভাঙচুর করে। পরবর্তীতে মেরামত করা হলেও শব্দযন্ত্রে এখনও ত্রুটি রয়ে গেছে।
এদিকে সংসদ সদস্যদের পক্ষ থেকে হেডফোন এবং শব্দের মাত্রা নিয়েও একাধিক অভিযোগ করা হয়েছে। এতে সংসদের কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে পরিচালনায় বিঘ্ন ঘটছে।
স্পিকার জানান, ভবিষ্যতে আবারও যদি এমন বিভ্রাট ঘটে, তাহলে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে লুজ কানেকশন প্রতিস্থাপন করে কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হবে। তবে তিনি স্বীকার করেন, বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত অসন্তোষজনক।
সার্বিকভাবে, জাতীয় সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে বারবার প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। দ্রুত এই সমস্যা সমাধান না হলে সংসদের কার্যকারিতা ও মর্যাদা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আকাশজমিন / আরআর