দেশে হঠাৎ করে হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১১ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ২৩৬ শিশুর মধ্যে হামের সংক্রমণ সন্দেহ করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে এবং শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় যে ১১ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, তাদের মধ্যে একজনের মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামজনিত। বাকি শিশুদের মধ্যে হামের উপসর্গ ছিল, যা পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপসর্গ থাকা অবস্থায় মৃত্যুর ঘটনাগুলোও সমানভাবে উদ্বেগজনক এবং দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
গত ১৫ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত মোট ২২ শিশুর মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামজনিত বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১২৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে ১ হাজার ৩৯৮ জন শিশু নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে। পাশাপাশি আরও ৬ হাজার ৮৮৩ শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা গেছে, যা দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হামের এই বিস্তার হঠাৎ করে বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে টিকাদানের ঘাটতি, সচেতনতার অভাব এবং স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে বিলম্ব অন্যতম কারণ হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক উপসর্গকে গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে রোগ দ্রুত জটিল আকার ধারণ করছে। ফলে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে জটিলতা বাড়ছে এবং মৃত্যুঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এদিকে সারা দেশে হামের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় সরকার ইতোমধ্যে জরুরি ভিত্তিতে হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। রোববার থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা অভিভাবকদের সন্তানদের নির্ধারিত টিকা নিশ্চিত করার জন্য জোর আহ্বান জানিয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। গত ২৪ ঘণ্টায় এই বিভাগে ১৮৬ শিশু নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৪৯৯ শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এর পরের অবস্থানে রয়েছে রাজশাহী বিভাগ, যেখানে সংক্রমণের হারও তুলনামূলকভাবে বেশি।
চিকিৎসকদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা দ্রুত একজন থেকে অন্যজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব শিশু এখনো টিকা পায়নি বা যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তারা বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে এই রোগ মারাত্মক জটিলতা তৈরি করতে পারে।
হামের সাধারণ উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বর, শরীরে লালচে ফুসকুড়ি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, কাশি এবং সর্দি। অনেক ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া বা ডায়রিয়ার মতো জটিলতাও দেখা দিতে পারে, যা শিশুর জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। তাই এসব উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি।
এদিকে হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় দেশের হাসপাতালগুলোতেও রোগীর চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু বিভাগে শয্যাসংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপরও চাপ বাড়ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
সব মিলিয়ে দেশে হামের এই প্রাদুর্ভাব একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে। এখন প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, দ্রুত টিকাদান এবং সচেতনতা বৃদ্ধি, যাতে শিশুদের জীবন রক্ষা করা যায় এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।