সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার আসামিদের ফেরত চাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ভারত সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে এই অনুরোধ জানানো হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। বিষয়টি সামনে এসেছে এমন সময়, যখন দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ভারত মহাসাগরীয় সম্মেলনে যোগ দিতে মরিশাস যাওয়ার পথে মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) দিল্লি সফরে যাচ্ছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। এই সফরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে শেখ হাসিনা এবং হাদি হত্যা মামলার আসামিদের ফেরত আনার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাবে বলে জানা গেছে।
দিল্লি সফরের শুরুতেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। সফরের দ্বিতীয় দিনে তিনি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করবেন। এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলোতে দুই দেশের অমীমাংসিত বিভিন্ন ইস্যুর পাশাপাশি অপরাধী প্রত্যর্পণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভারতে অবস্থানরত যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে বাংলাদেশে মামলা রয়েছে বা যাদের সাজা হয়েছে, তাদের ফিরিয়ে আনার বিষয়টি এই সফরের অন্যতম প্রধান এজেন্ডা। তিনি বলেন, এই বিষয়ে ভারতের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা হবে এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অগ্রগতি আশা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে ইনকিলাব মঞ্চের প্রধান শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার আসামিদের ফেরত আনার বিষয়ে সরকার আশাবাদী। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই মামলার অগ্রগতি এবং বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গত ৭ ও ৮ মার্চ রাতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ এলাকা থেকে হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম এবং তার সহযোগী আলমগীর শেখকে গ্রেপ্তার করে সে দেশের তদন্তকারী সংস্থা। তাদের দুই দফায় রিমান্ডে নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
তবে আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধান আসামি ফয়সাল করিম এই হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বিশেষ টাস্কফোর্স (এসটিএফ) প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে জানিয়েছিল, অভিযুক্তরা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আরও জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তের স্বার্থে এই দুই আসামিকে দিল্লিতে স্থানান্তর করা হয়েছে। তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, এই মামলার নেপথ্যে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদঘাটিত হতে পারে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পুরানা পল্টনের কালভার্ট রোড এলাকায় রিকশায় থাকা অবস্থায় শরিফ ওসমান বিন হাদিকে লক্ষ্য করে দুর্বৃত্তরা গুলি চালায়। মোটরসাইকেলে আসা হামলাকারীরা তার মাথায় গুলি করে দ্রুত পালিয়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান।
এদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরানোর বিষয়টিও এই সফরে গুরুত্বপূর্ণভাবে আলোচিত হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শেখ হাসিনাসহ ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেকেরই বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে বা চলমান রয়েছে। শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য এর আগেও ভারত সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে ওঠা মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাকে দেশে ফেরানোর দাবি জানানো হয়। বর্তমানে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হতে পারে। বিশেষ করে সমমর্যাদা ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরে শুধু রাজনৈতিক বিষয় নয়, বরং ব্যবসা-বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা, গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক করার মতো বিষয়গুলোও আলোচনায় আসবে। ফলে এই সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দিল্লি সফরের পর ৯ এপ্রিল ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে একই ফ্লাইটে মরিশাসে যাবেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এই সফরের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের বাইরে আরও অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সব মিলিয়ে বলা যায়, শেখ হাসিনা ও হাদি হত্যা মামলার আসামিদের ফেরত আনার উদ্যোগ এবং দিল্লি সফরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন এক মোড় নিতে যাচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, এই আলোচনার ফলাফল কতটা বাস্তবায়নযোগ্য হয় এবং দুই দেশের সম্পর্ক কোন দিকে এগোয়।
আকাশজমিন / আরআর