আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান আলোচনা এখনো চূড়ান্ত কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি বলে জানিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। শনিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা এখনো গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে আটকে রয়েছে এবং দুই দেশ এখনো চূড়ান্ত কোনো চুক্তি থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে। যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে এমন মন্তব্য নতুন করে উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে এবং একটি চুক্তি প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তবে তিনি অভিযোগ করেন, ইরান আলোচনার সময় কিছুটা কৌশলগত চালাকি করছে। ট্রাম্প দাবি করেন, তেহরান ইতোমধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ছাড় দিয়েছে, যা চুক্তির সম্ভাবনাকে আরও এগিয়ে নিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি ইরান চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না।
আলোচনার বর্তমান অচলাবস্থার মূল কারণ হিসেবে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমত, ইরানের ইউরেনিয়াম মজুতের ভবিষ্যৎ। কিছুদিন আগে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে ইরান তার উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাতে সম্মত হয়েছে। তবে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এ ধরনের শর্ত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। জানা গেছে, ইরানের কাছে বর্তমানে প্রায় ৪০০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। একটি প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এই মজুত হস্তান্তরের বিনিময়ে ইরানের জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করা হতে পারে। তবে ইরান ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সম্পদ মুক্ত এবং বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার দাবি জানিয়েছে, যা এখনো আলোচনায় বড় বাধা হয়ে আছে।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হলো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির সীমাবদ্ধতা। ইরান কতদিনের জন্য এই কর্মসূচি স্থগিত রাখবে তা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য রয়েছে। ইরানি পক্ষের দাবি, তারা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে কোনো দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা মেনে নেবে না। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা গত সপ্তাহান্তে ২০ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখার প্রস্তাব দেয়। এর বিপরীতে ইরান মাত্র ৫ বছরের জন্য স্থগিত রাখার প্রস্তাব দেয়, যা যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাখ্যান করে।
তৃতীয় ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি। প্রায় দুই মাস কার্যত বন্ধ থাকার পর ইরান সম্প্রতি ঘোষণা দেয়, তারা গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু করবে। এতে বৈশ্বিক বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও তা বেশি সময় স্থায়ী হয়নি। ইরান পরে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ও চাপের প্রতিক্রিয়ায় তারা আবারও জাহাজ চলাচলের ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই তিনটি ইস্যু—ইউরেনিয়াম মজুত, সমৃদ্ধকরণ সীমাবদ্ধতা এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ—সমাধান না হলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো স্থায়ী চুক্তি সম্ভব নয়। পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে এবং যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
আকাশজমিন / আরআর