ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি সরকারি সফরে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে পৌঁছেছেন। গতকাল শুক্রবার একটি ছোট প্রতিনিধি দল নিয়ে তিনি ইসলামাবাদে অবতরণ করেন। এই সফরকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার টানাপোড়েন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যু এই বৈঠকের গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে।
ইসলামাবাদে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে স্বাগত জানান পাকিস্তানের সেনা ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নাকভি। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, এই সফর ঘিরে ইসলামাবাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছে।
বিমানবন্দর থেকে সরাসরি ইরানি প্রতিনিধি দলকে নিয়ে যাওয়া হয় সেরেনা হোটেলে। সেখানে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেন সৈয়দ আব্বাস আরাগচি। বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং চলমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয় বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।
এ সফর এমন এক সময় অনুষ্ঠিত হলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা কিছুটা কমলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। পারমাণবিক কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা দ্বন্দ্বের জেরে চলমান সংঘাত ও যুদ্ধবিরতির মধ্যেও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান এ অঞ্চলে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজের ভূমিকা আরও জোরদার করার চেষ্টা করছে।
এর আগে একই সেরেনা হোটেলেই চলতি বছরের ১১ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই আলোচনায় দীর্ঘ সময় বৈঠক হলেও কোনো চূড়ান্ত চুক্তি বা সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। সেই সময় বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এবং ইরানের পক্ষ থেকে পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ নেতৃত্ব দেন। প্রায় ২১ ঘণ্টা ধরে চলা সেই সংলাপ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়।
বর্তমান সফরে কূটনৈতিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে, একটি নতুন দফার সংলাপের প্রস্তুতি চলছে। তবে এবার আলোচনায় আগের মতো উচ্চপর্যায়ের কিছু নেতা অনুপস্থিত থাকতে পারেন। পশ্চিমা গণমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফা সংলাপে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলে জে ডি ভ্যান্স না-ও থাকতে পারেন। একইভাবে ইরানি প্রতিনিধি দলে মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফের অনুপস্থিতির সম্ভাবনার কথাও আলোচনা হচ্ছে।
এদিকে আরাগচির পাকিস্তান সফরকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক কূটনৈতিক তৎপরতা আরও বেড়েছে। কাতারের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার বরাতে জানা গেছে, কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে টেলিফোনে আলোচনার সময় মধ্যস্থতা ইস্যু উঠে আসে। সেখানে কাতারের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের উদ্যোগকে সমর্থন জানানো হয়েছে বলে জানানো হয়।
পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্য সংকটে কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে। দেশটি ইরান ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসলামাবাদ আবারও একটি সম্ভাব্য আলোচনার কেন্দ্র হিসেবে উঠে এসেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান অস্থিরতা যদি সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের দিকে অগ্রসর হয়, তবে পাকিস্তানের এই মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করছে দুই পক্ষের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আস্থা পুনর্গঠনের ওপর।
বর্তমানে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপের কারণে এই বৈঠক ও সম্ভাব্য সংলাপকে ঘিরে বিশ্ব সম্প্রদায়ের নজর এখন ইসলামাবাদের দিকে।